- Factors of Education-teacher, Learner, Curriculum, School
- Child centric education and its importance
- Learners in context: situating learner in the Socio-political and cultural context
Table of Contents
Toggle2.1 Factors of Education-teacher, Learner, Curriculum, School
2.1.1 শিক্ষার উপাদান হিসেবে শিক্ষক
আধুনিক শিক্ষা প্রক্রিয়ায় অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেন শিক্ষক। কার্যত তাঁর হাতেই থাকে শিক্ষাপ্রক্রিয়ার সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি। বিকাশমুখী শিক্ষার্থীর সামগ্রিক ব্যক্তিত্ব গঠনের ক্ষেত্রে এক সার্থক রূপকার তিনি। পরিবারে পিতা-মাতার হাত ধরে শিশু শিক্ষার্থী জীবনের চলার পথে যাত্রা শুরু করলেও শিক্ষকই তাকে যথার্থ পথের সন্ধান দিয়ে শিক্ষার্থীর আচরণধারাকে সমাজ-অনুমোদিত পথে চলতে সাহায্য করেন। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে যথার্থ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে শিক্ষকের ভূমিকা তাই অতুলনীয়।
সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষককে এমন কতকগুলি গুণের অধিকারী হতে হয়, যাতে তিনি একদিকে নিজে সার্থক মানবসম্পদ হবেন, আবার শিক্ষার্থীকে তাঁর গুণের দ্বারা মানবসম্পদে বিকশিত করে তুলবেন।
শিক্ষকের গুণাবলি ও নীতিবোধ
শিক্ষার উল্লেখযোগ্য উপাদানগুলির মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শিক্ষক। বৃত্তিগত দক্ষতা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং দেশ ও জাতির জন্য উৎসর্গীকৃত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর শিক্ষকের গুরুত্ব বিশেষভাবে নির্ভরশীল। ভারতীয় শিক্ষা কমিশন (কোঠারি কমিশন) শিক্ষকের গুণাবলি ও ভূমিকার গুরুত্বের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে।
২.১.১.১ শিক্ষকের ব্যক্তিগত গুণাবলি
(Individual qualities of Teacher)
শিক্ষকের যে সমস্ত ব্যক্তিগত গুণাবলি থাকা দরকার সেগুলি হল:
- শিক্ষক সুব্যক্তিত্বের অধিকারী হবেন। তাঁর আচরণধারা এবং চিন্তাভাবনায় সুসংহত ব্যক্তিত্বের রূপ প্রকাশিত হবে।
- শিক্ষক উন্নত ও নির্মল চরিত্রের অধিকারী হবেন। তাঁর উন্নত জীবনাদর্শ শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করবে এবং তাঁদের নিকট দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
- শিক্ষক হবেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। তাঁর সৌম্য, সুস্থ দৈহিক বৈশিষ্ট্য অন্যের নিকট দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
- একজন শিক্ষকের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও বিচারক্ষমতা থাকা দরকার। তাঁর বুদ্ধ্যাঙ্ক ১২০-এর বেশি হলে ভালো—এই বক্তব্যটি ছবিতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
- শিক্ষক যথেষ্ট দায়িত্ববোধসম্পন্ন হবেন। তাঁর দায়িত্ববোধ শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব সচেতন হতে প্রভাবিত করবে।
- শিক্ষক হবেন যথার্থ প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। রক্ষণশীলতা বর্জন করে তাঁর চিন্তা ও কর্মে প্রগতিশীলতার বৈশিষ্ট্য থাকবে।
- শিক্ষক হবেন একদিকে আত্মবিশ্বাসী, অন্যদিকে সহনশীল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। সহনশীল মানসিকতায় বিভিন্ন মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের পরিচালিত করবেন।
- শিক্ষক হবেন নিয়মনিষ্ঠার ব্যক্তি। তাঁর নিয়মনিষ্ঠা শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে এবং তাঁর প্রতি শিক্ষার্থীরা শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে।
- শিক্ষক হবেন প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ।
- মানসিক দিক থেকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া দরকার একজন শিক্ষকের। তাঁর মধ্যে প্রক্ষোভমূলক/আবেগগত ভারসাম্য অবশ্যই থাকা দরকার।
- শিক্ষকের মানবপ্রেম যেমন থাকবে, তেমনই তিনি হবেন একজন [শিক্ষা/শিক্ষার্থী]-প্রেমী। শিক্ষার্থীদের নিকট তাঁর উপস্থিতি হবে আনন্দদায়ক। তাঁর সেবাধর্মী কর্মপ্রচেষ্টা তাঁর মধ্যে আত্মতৃপ্তি আনবে এবং শিক্ষার্থীদের নিকট তাঁকে আকর্ষণীয় করে তুলবে।
- শিক্ষকের থাকা দরকার আধুনিকতার দৃষ্টিভঙ্গি, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতা।
২.১.১.২ শিক্ষকের পেশাগত গুণাবলি
ছবিতে যে পয়েন্টগুলি পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে:
- একজন শিক্ষক প্রথম হবেন শিক্ষক, আবার শেষেও থাকবেন শিক্ষক। নিজের পেশার প্রতি নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ বজায় রাখা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।
- বিষয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞান থাকা দরকার। ছবির পরবর্তী অংশে দর্শন, মনোবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতি, রাষ্ট্রতত্ত্ব, পরিসংখ্যান ও যুক্তিবিজ্ঞানের মতো বিষয়ের পর্যাপ্ত জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে।
- যে-কোনো বিষয়ে শিক্ষককে শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ বিকাশে সহায়তা করতে হবে। সেই কারণে সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, তার জ্ঞান ও ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষককে সচেতন থাকতে হবে।
- প্রকৃত অর্থে একজন শিক্ষককে তাঁর পেশাগত সাফল্য পেতে হলে জ্ঞানপিপাসু এবং নিয়মিত পাঠে অভ্যস্ত হতে হবে। শিক্ষক নিজেও একজন শিক্ষার্থীর মতো আজীবন শেখার মানসিকতা রাখবেন। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি উক্তিও দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ছবির মানের কারণে ইংরেজি অংশটি সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে পড়া যাচ্ছে না।
- বিষয়বস্তুর পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকলেই হবে না; শিক্ষককে জানতে হবে কীভাবে সেই জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চারিত করা যায়। এজন্য শিক্ষকের শিক্ষণ-পদ্ধতি ও কৌশলের জ্ঞান এবং প্রয়োগক্ষমতা থাকা দরকার।
- শিক্ষণ পদ্ধতি ও কৌশলকে কার্যকর করতে শিক্ষণ-প্রদীপন/শিক্ষণ-সহায়ক উপকরণের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে হবে। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের চার্ট, মডেল, মানচিত্র এবং অন্যান্য শিক্ষণ-উপকরণ ব্যবহার করতে হবে।
- সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির পরিচালনা সম্পর্কেও শিক্ষককে জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
- শিক্ষার্থীদের শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতি পরিমাপের জন্য মূল্যায়ন ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা দরকার। প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা—যেমন গঠনমূলক মূল্যায়ন ও সামগ্রিক মূল্যায়ন—সম্পর্কে শিক্ষকের অভিজ্ঞতা থাকা দরকার।
- শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা ও নেতৃত্বদানের ক্ষমতা শিক্ষকের থাকতে হবে।
- শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে বিষয়বস্তুর উপস্থাপনার রীতি ও পদ্ধতির প্রয়োগ জানতে হবে। উপস্থাপনের সঙ্গে উপযুক্তভাবে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার কৌশল সম্পর্কেও অবহিত থাকতে হবে। প্রশ্নকরণের দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণে সফল হতে পারেন।
- শিক্ষক হবেন উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন ও সৃজনশীলতার অধিকারী। শ্রেণিকক্ষে শ্রেণি-পরিচালনার গতিকে বজায় রাখতে শিক্ষককে উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে; সৃষ্টিশীলতার দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি স্বচ্ছন্দ হয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগী করে তুলতে সক্ষম হবেন।
২.১.১.৩ শিক্ষকের নীতিবোধ
(Ethics of Teacher)
যথার্থ শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হল নৈতিক মানসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। যথার্থ শিক্ষা শিক্ষার্থীকে উচিত-অনুচিত, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা সম্পর্কে অবহিত করে নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষে পরিণত করে। স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের শিক্ষার্থীকে গঠন করতে সক্ষম নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষক প্রয়োজন।
শিক্ষকের নীতিবোধের বিষয়গুলি সংক্ষেপে:
- শিক্ষার্থীর দৈহিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক, নৈতিক উন্নতি ও কল্যাণের জন্য শিক্ষক সর্বদা ও সর্বকাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন।
- ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শিক্ষক কখনোই বিদ্যালয়ের নাম, যশ, প্রতিষ্ঠার প্রভাবকে কাজে লাগাবেন না।
- শিক্ষক হবেন সৎ, ন্যায়পরায়ণ, মূল্যবোধসম্পন্ন এবং নৈতিক চরিত্রের অধিকারী। তাঁর দৃষ্টান্তযোগ্য নৈতিক আচরণ শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্রকে প্রভাবিত করবে।
- শিক্ষক তাঁর অভ্যাস, আচার-আচরণ এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সংযমী, ধীর ও শান্ত প্রকৃতির হবেন। সকল প্রকার কুসংস্কার ও নেশা থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখবেন।
- শিক্ষক তাঁর পেশাগত জীবনে নিজের মর্যাদা (dignity) ও সংহতিবোধ (solidarity) সকল সময় বজায় রাখার চেষ্টা করবেন।
- শিক্ষক তাঁর কাজে হবেন অত্যন্ত সময়সচেতন ও নিয়মনিষ্ঠ।
- শিক্ষার বিভিন্ন দিকে যে সমস্ত আধুনিক চিন্তার প্রসার, জ্ঞানের সঞ্চারণ এবং উন্নয়ন সংঘটিত হচ্ছে সেগুলির সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করবেন।
- শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের নিকটই নয়, অভিভাবক, সামাজিক গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের নিকটও শিক্ষক তাঁর নৈতিক আচরণকে সবসময় তুলে ধরবেন।
- ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শিক্ষক কখনোই কোনো পাঠ্যপুস্তক বা অন্য কোনো উপকরণের জন্য সুপারিশ করবেন না।
- অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির টানে কখনোই একজন শিক্ষক প্রাইভেট টিউশন করবেন না।
2.1.2 শিক্ষার উপাদান হিসেবে শিক্ষার্থী
শিক্ষার উপাদান হিসেবে শিক্ষার্থী (Learner as a Factor of Education)
শিক্ষা একটি গতিশীল, উদ্দেশ্যমুখী এবং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, আবেগীয় ও বৌদ্ধিক বিকাশ সাধিত হয়। শিক্ষাকে কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের প্রয়োজন হয়। সাধারণভাবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পাঠক্রম এবং বিদ্যালয়—এই চারটি শিক্ষার প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। এর মধ্যে শিক্ষার্থী বা Learner হল শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্রীয় উপাদান। কারণ শিক্ষার সমস্ত পরিকল্পনা, পদ্ধতি, পাঠক্রম, মূল্যায়ন এবং শিক্ষকের কার্যকলাপ মূলত শিক্ষার্থীর বিকাশ ও কল্যাণকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীকে কেবল শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণকারী হিসেবে দেখা হয় না। বরং তাকে সক্রিয়, অনুসন্ধিৎসু, সৃজনশীল এবং নিজস্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান নির্মাণে সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষার্থীর আগ্রহ, সামর্থ্য, প্রয়োজন, অভিজ্ঞতা, মানসিক প্রস্তুতি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর।
শিক্ষার্থী বলতে কী বোঝায়?
যে ব্যক্তি শিক্ষা প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে, নতুন জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও আচরণ অর্জন করে এবং নিজের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায়, তাকে শিক্ষার্থী বা Learner বলা হয়। শিক্ষার্থী শুধু বিদ্যালয়ের শিশু বা কিশোর নয়; যে কোনো বয়সে যে ব্যক্তি নতুন কিছু শেখে, সে অর্থে সেও একজন শিক্ষার্থী।
প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীকে অনেক সময় নিষ্ক্রিয় জ্ঞানগ্রহীতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। শিক্ষক বলবেন এবং শিক্ষার্থী শুনবে—এই ছিল মূল ধারণা। কিন্তু আধুনিক শিক্ষায় এই ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীকে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষার্থী প্রশ্ন করে, আলোচনা করে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, সমস্যা সমাধান করে, অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং নিজের জ্ঞানকে ক্রমশ সমৃদ্ধ করে।
শিক্ষার উপাদান হিসেবে শিক্ষার্থীর গুরুত্ব
শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হল শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ বিকাশ। শিক্ষার্থী না থাকলে শিক্ষাদান, পাঠক্রম বা মূল্যায়নের কোনো অর্থ থাকে না। একজন শিক্ষক যতই দক্ষ হন বা একটি পাঠক্রম যতই উন্নত হোক, শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়।
শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও সক্ষমতার ভিত্তিতেই শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। কোন বিষয় কীভাবে শেখানো হবে, কোন শিক্ষণ-পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে, কী ধরনের শিক্ষণ-সহায়ক উপকরণ প্রয়োজন এবং কীভাবে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে—এসব বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য
প্রত্যেক শিক্ষার্থী স্বতন্ত্র। একই বয়সের বা একই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বুদ্ধি, আগ্রহ, মনোযোগ, স্মৃতি, শারীরিক সক্ষমতা, আবেগ, সামাজিক আচরণ ও শেখার গতিতে পার্থক্য থাকে। তাই একজন শিক্ষকের পক্ষে সব শিক্ষার্থীকে একই পদ্ধতিতে শেখানো সবসময় কার্যকর হয় না।
কেউ গণিতে আগ্রহী হতে পারে, আবার কেউ ভাষা, বিজ্ঞান, ছবি আঁকা, সংগীত বা খেলাধুলায় বেশি দক্ষ হতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী দ্রুত শেখে, আবার অন্য একজন একই বিষয় বুঝতে বেশি সময় নেয়। শিক্ষকের উচিত এই ব্যক্তিগত পার্থক্যগুলিকে স্বীকার করা এবং শিক্ষার্থীর নিজস্ব সামর্থ্য অনুযায়ী শেখার সুযোগ তৈরি করা।
শিক্ষার্থীর শারীরিক বিকাশ
শিক্ষার্থীর শারীরিক স্বাস্থ্য তার শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুস্থ শরীর শিক্ষার্থীর মনোযোগ, সক্রিয়তা, উপস্থিতি এবং শেখার ক্ষমতাকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য, বিশ্রাম, ঘুম, শারীরিক কার্যকলাপ এবং বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শারীরিকভাবে দুর্বল, অসুস্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সহায়তা ও উপযুক্ত শিক্ষণ-পরিবেশ তৈরি করা উচিত।
শিক্ষার্থীর মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ
শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটানো। শিক্ষার্থীকে শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়; তাকে চিন্তা করতে, যুক্তি দিতে, প্রশ্ন করতে, বিশ্লেষণ করতে এবং সমস্যার সমাধান করতে শেখানো প্রয়োজন।
একজন সক্রিয় শিক্ষার্থী কোনো বিষয়কে অন্ধভাবে গ্রহণ করে না। সে জানতে চায়—কেন, কীভাবে এবং এর ফল কী হতে পারে। এই অনুসন্ধিৎসু মনোভাবই শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে। তাই শিক্ষকের উচিত শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া এবং তাদের কৌতূহলকে উৎসাহিত করা।
শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও প্রেরণা
শেখার ক্ষেত্রে আগ্রহ ও প্রেরণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে বিষয় শিক্ষার্থীর কাছে আকর্ষণীয়, সেটি শেখার ক্ষেত্রে সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। অন্যদিকে কোনো বিষয়কে কঠিন, একঘেয়ে বা অর্থহীন মনে হলে শিক্ষার্থীর আগ্রহ কমে যেতে পারে।
তাই শিক্ষার্থীর আগ্রহকে শিক্ষণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। বাস্তব জীবনের উদাহরণ, গল্প, প্রকল্প, দলগত কাজ, আলোচনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ছবি, ভিডিও এবং বিভিন্ন কার্যক্রম শিক্ষার্থীর শেখার আগ্রহ বৃদ্ধি করতে পারে।
শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞান ও অভিজ্ঞতা
প্রত্যেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসার আগে পরিবার, সমাজ এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে কিছু জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এই পূর্বজ্ঞানকে শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন জ্ঞান সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে শেখানোর পরিবর্তে শিক্ষার্থীর পূর্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন বিষয়ের সম্পর্ক স্থাপন করলে শেখা আরও অর্থবহ হয়। যেমন, দৈনন্দিন জীবনে জল, মাটি, গাছ, প্রাণী বা বাজারের অভিজ্ঞতা থেকেই বিজ্ঞান ও গণিতের বিভিন্ন ধারণা শেখানো যেতে পারে।
শিক্ষার্থীর সামাজিক বিকাশ
মানুষ সামাজিক জীব এবং শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হল শিক্ষার্থীকে সমাজের উপযুক্ত সদস্য হিসেবে গড়ে তোলা। বিদ্যালয়ে বিভিন্ন শিক্ষার্থীর সঙ্গে মেলামেশা, দলগত কাজ, খেলাধুলা, আলোচনা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থী সহযোগিতা, সহনশীলতা, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সম্মান শেখে।
একজন শিক্ষার্থীকে শুধু নিজের সাফল্যের কথা ভাবলে চলবে না; তাকে অন্যের অধিকার ও অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। এই সামাজিক গুণাবলি ভবিষ্যৎ জীবনে তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত সাফল্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষার্থীর আবেগীয় বিকাশ
শিক্ষার্থীর আবেগ তার শেখার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ভয়, উদ্বেগ, অপমান, অতিরিক্ত চাপ বা নিরাপত্তাহীনতা শিক্ষার্থীর শেখার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, উৎসাহ, স্বীকৃতি এবং আত্মবিশ্বাস শিক্ষার্থীকে আরও সক্রিয় করে তোলে।
তাই বিদ্যালয়ে এমন পরিবেশ থাকা দরকার যেখানে শিক্ষার্থী ভুল করতে ভয় পাবে না এবং নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারবে। শিক্ষককে শিক্ষার্থীর আবেগ ও অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে।
শিক্ষার্থীর নৈতিক বিকাশ
শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মধ্যে সততা, ন্যায়বোধ, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, সহানুভূতি, সহযোগিতা এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধার মতো নৈতিক গুণ গড়ে ওঠে। শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ শিক্ষার্থীর নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও শিক্ষার্থীর নিজস্ব আচরণ ও অভিজ্ঞতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থী যখন নিজের কাজের ফলাফল বুঝতে শেখে এবং সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে, তখন তার নৈতিক চেতনা ধীরে ধীরে বিকশিত হয়।
শিক্ষার্থী হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী
আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীকে active participant হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে শুধু শিক্ষকের বক্তব্য শুনবে না; বরং প্রশ্ন করবে, আলোচনা করবে, তথ্য সংগ্রহ করবে, পরীক্ষা করবে, সমস্যা সমাধান করবে এবং নিজের মতামত প্রকাশ করবে।
শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ শিক্ষাকে আরও অর্থবহ করে তোলে। প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, সমস্যা-ভিত্তিক শিক্ষা, সহযোগিতামূলক শিক্ষা, অনুসন্ধানমূলক শিক্ষা এবং কার্যভিত্তিক শিক্ষণ শিক্ষার্থীকে সক্রিয় করে তুলতে বিশেষভাবে কার্যকর।
শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত পার্থক্য
শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত পার্থক্য শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বুদ্ধিমত্তা, আগ্রহ, শেখার গতি, ভাষাগত দক্ষতা, পারিবারিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক পটভূমি, শারীরিক সক্ষমতা এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা একে অপরের থেকে আলাদা।
এই কারণে শিক্ষকের উচিত একটিমাত্র নির্দিষ্ট পদ্ধতির পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শিক্ষণ-পদ্ধতি ব্যবহার করা। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী, ধীরগতির শিক্ষার্থী এবং মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্যও উপযুক্ত শিক্ষণ-সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীর দায়িত্ব
শিক্ষার্থী শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও তার কিছু দায়িত্বও রয়েছে। তাকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে হবে, সময়ের মূল্য বুঝতে হবে, শিক্ষক ও সহপাঠীদের সম্মান করতে হবে, বিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে চলতে হবে এবং নিজের পড়াশোনার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।
এছাড়া শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করার, অনুসন্ধান করার এবং নিজের ভুল থেকে শেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। নিজের প্রতিভা ও দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উন্নতির চেষ্টা করাও শিক্ষার্থীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক
শিক্ষার সাফল্যের জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সুস্থ, সম্মানজনক ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক শুধু জ্ঞানদাতা নন; তিনি শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক, সহায়ক এবং অনুপ্রেরণাদাতা। একইভাবে শিক্ষার্থীও কেবল নির্দেশ পালনকারী নয়; সে শিক্ষণ-শেখন প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, সহযোগিতা এবং মুক্ত যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক শক্তিশালী হলে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পরিবেশও ইতিবাচক হয়।
শিক্ষার্থীর মূল্যায়নে ভূমিকা
শিক্ষার্থীর অগ্রগতি বোঝার জন্য মূল্যায়ন অপরিহার্য। তবে মূল্যায়নের উদ্দেশ্য কেবল নম্বর দেওয়া নয়। মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থী কী শিখেছে, কোথায় সমস্যা রয়েছে এবং কোন ক্ষেত্রে আরও সহায়তা প্রয়োজন তা চিহ্নিত করা যায়।
আধুনিক শিক্ষায় গঠনমূলক মূল্যায়ন, নির্ণায়ক মূল্যায়ন, সামষ্টিক মূল্যায়ন, স্ব-মূল্যায়ন এবং সহপাঠী মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থী নিজের শেখার অবস্থাও বুঝতে পারে। এতে শিক্ষার্থী নিজের উন্নতির জন্য আরও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষার গুরুত্ব
শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর প্রয়োজন, আগ্রহ, ক্ষমতা এবং অভিজ্ঞতাকে শিক্ষার কেন্দ্রে রাখা হয়। এখানে শিক্ষক একমাত্র বক্তা নন; বরং তিনি শিক্ষার্থীর শেখার পরিবেশ তৈরি করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা দেন।
এই ধরনের শিক্ষায় শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সহযোগিতামূলক মনোভাব এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। ফলে শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বাস্তব জীবনের জন্য শিক্ষার্থীকে প্রস্তুত করে।
2.1.3 শিক্ষার উপাদান হিসেবে পাঠক্রম
শিক্ষার উপাদান হিসেবে পাঠক্রম (Curriculum as a Factor of Education)
১. পাঠক্রমের অর্থ (Meaning of Curriculum)
‘Curriculum’ শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ‘Currere’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘দৌড়ের পথ’ বা ‘যে পথে এগিয়ে যেতে হয়’। শিক্ষার ক্ষেত্রে পাঠক্রম বলতে শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট শিক্ষালক্ষ্য অর্জনের জন্য বিদ্যালয় কর্তৃক পরিকল্পিত ও সংগঠিত সমস্ত শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা, বিষয়বস্তু, কার্যক্রম ও অভিজ্ঞতার সমষ্টিকে বোঝায়। আধুনিক ধারণায় পাঠক্রম কেবল পাঠ্যবই বা নির্দিষ্ট বিষয়ের তালিকা নয়; এর মধ্যে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম, প্রকল্প, ব্যবহারিক কাজ, খেলাধুলা, সামাজিক অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধের শিক্ষা এবং মূল্যায়নও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ বিকাশের জন্য বিদ্যালয় যে সমস্ত পরিকল্পিত অভিজ্ঞতার ব্যবস্থা করে, তার সামগ্রিক রূপই হল পাঠক্রম।
২. পাঠক্রমের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Curriculum)
- ১. উদ্দেশ্যমুখী: পাঠক্রম সর্বদা নির্দিষ্ট শিক্ষাগত উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তৈরি করা হয়। শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, মনোভাব, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ পাঠক্রমের অন্যতম লক্ষ্য। তাই পাঠক্রমের বিষয়বস্তু ও কার্যক্রম এমনভাবে নির্বাচন করা হয় যাতে নির্ধারিত শিক্ষালক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়। উদ্দেশ্যহীনভাবে বিষয়ের তালিকা তৈরি করাকে প্রকৃত পাঠক্রম বলা যায় না।
- ২. শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক: আধুনিক পাঠক্রম শিক্ষার্থীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। শিক্ষার্থীর বয়স, মানসিক বিকাশ, আগ্রহ, চাহিদা, সামর্থ্য, পূর্বজ্ঞান ও ব্যক্তিগত পার্থক্য পাঠক্রম প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়। একই বিষয় সব শিক্ষার্থীর কাছে সমানভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীর বৈচিত্র্যকে সম্মান করে পাঠক্রমকে আরও নমনীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা প্রয়োজন।
- ৩. সর্বাঙ্গীণ বিকাশমুখী: পাঠক্রমের লক্ষ্য শুধু শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক বিকাশ নয়। শারীরিক, মানসিক, আবেগীয়, সামাজিক, নৈতিক, নান্দনিক ও সৃজনশীল বিকাশও পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত। খেলাধুলা, সংগীত, শিল্পচর্চা, বিতর্ক, সামাজিক সেবা, প্রকল্পকাজ এবং বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক বিকশিত করতে সাহায্য করে। ফলে পাঠক্রম শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনযাপনের জন্যও প্রস্তুত করে।
- ৪. গতিশীল ও পরিবর্তনশীল: সমাজ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের প্রয়োজনও পরিবর্তিত হয়। তাই পাঠক্রম কখনো স্থির থাকতে পারে না। নতুন জ্ঞান, প্রযুক্তি, সামাজিক চাহিদা এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠক্রমকে নিয়মিত সংশোধন ও পরিমার্জন করতে হয়। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল শিক্ষা, তথ্য-প্রযুক্তি, পরিবেশ সচেতনতা, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও জীবনদক্ষতার মতো বিষয় পাঠক্রমে গুরুত্ব পাচ্ছে।
- ৫. অভিজ্ঞতাভিত্তিক: আধুনিক পাঠক্রমে শুধু বই পড়ে জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রকল্প, ক্ষেত্রসমীক্ষা, দলগত কাজ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে শেখে। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান সাধারণত বেশি স্থায়ী ও অর্থবহ হয়। তাই পাঠক্রমে শিক্ষার্থীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় ধরনের শিক্ষণ-অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
- ৬. সমাজ ও জীবনমুখী: পাঠক্রম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয়বস্তুর সমষ্টি নয়। একজন শিক্ষার্থী যে সমাজে বসবাস করে, সেই সমাজের মূল্যবোধ, সমস্যা, সংস্কৃতি, প্রয়োজন ও প্রত্যাশার সঙ্গে পাঠক্রমের সম্পর্ক থাকা দরকার। পরিবেশ সংরক্ষণ, স্বাস্থ্য, নাগরিক দায়িত্ব, সামাজিক সম্প্রীতি, লিঙ্গসমতা, মানবাধিকার ও সামাজিক দায়িত্বের মতো বিষয় শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে পাঠক্রম শিক্ষার্থীকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
- ৭. নমনীয়তা: একটি আদর্শ পাঠক্রম পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী কিছুটা পরিবর্তনযোগ্য হওয়া উচিত। সব বিদ্যালয়, অঞ্চল বা শিক্ষার্থীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ এক নয়। তাই স্থানীয় প্রয়োজন, শিক্ষার্থীর সক্ষমতা এবং বিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী পাঠক্রমের বাস্তবায়নে নমনীয়তা থাকা দরকার। নমনীয় পাঠক্রম শিক্ষককে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষণ-পদ্ধতি ও কার্যক্রম পরিবর্তনের সুযোগ দেয়।
- ৮. ধারাবাহিক ও ক্রমবিন্যস্ত: পাঠক্রমের বিষয়বস্তু এলোমেলোভাবে সাজানো হয় না। সাধারণত সহজ থেকে কঠিন, পরিচিত থেকে অপরিচিত এবং নির্দিষ্ট স্তর থেকে অধিক জটিল স্তরের দিকে বিষয়বস্তু বিন্যস্ত করা হয়। এক শ্রেণির শিক্ষার সঙ্গে পরবর্তী শ্রেণির শিক্ষার একটি যৌক্তিক সম্পর্ক থাকে। এই ধারাবাহিকতা শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও দক্ষতার ক্রমাগত বিকাশে সহায়তা করে।
- ৯. সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমসমৃদ্ধ: আধুনিক পাঠক্রম শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যবিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, কুইজ, স্কাউটিং, সামাজিক সেবা, শিক্ষামূলক ভ্রমণ, বিজ্ঞান প্রদর্শনী, ক্লাব কার্যক্রম ইত্যাদিও পাঠক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে নেতৃত্ব, সহযোগিতা, শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের মতো গুণাবলি বিকশিত হয়।
- ১০. মূল্যায়ন-নির্ভর ও উন্নয়নমুখী: পাঠক্রমের কার্যকারিতা বোঝার জন্য মূল্যায়ন অপরিহার্য। মূল্যায়নের মাধ্যমে বোঝা যায় শিক্ষার্থী নির্ধারিত শিক্ষালক্ষ্য কতটা অর্জন করেছে এবং কোথায় তার আরও সহায়তা প্রয়োজন। আধুনিক পাঠক্রমে শুধু চূড়ান্ত পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক মূল্যায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। মূল্যায়নের ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষক শিক্ষণ-পদ্ধতি পরিবর্তন করতে এবং পাঠক্রমকে আরও কার্যকর করতে পারেন।
৩. পাঠক্রমের কার্যাবলি (Functions of Curriculum)
- ১. শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা: পাঠক্রম শিক্ষার উদ্দেশ্যকে বাস্তব শিক্ষণ-কার্যক্রমে রূপান্তরিত করে। কোন বিষয় শেখানো হবে, কী ধরনের দক্ষতা গড়ে তোলা হবে এবং কী ধরনের মূল্যবোধ শিক্ষার্থীর মধ্যে তৈরি করা হবে—এসব নির্ধারণে পাঠক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- ২. শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ বিকাশ: পাঠক্রম শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক বিকাশের পাশাপাশি শারীরিক, সামাজিক, নৈতিক, আবেগীয় ও সৃজনশীল বিকাশে সহায়তা করে। ফলে শিক্ষার্থী একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
- ৩. জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন: পাঠক্রম শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেয়। ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়।
- ৪. মূল্যবোধ ও নৈতিকতা গঠন: সততা, দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা, সহনশীলতা, ন্যায়বোধ, দেশপ্রেম ও মানবিকতার মতো মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পাঠক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নৈতিক শিক্ষা শিক্ষার্থীকে সমাজের দায়িত্বশীল সদস্য হতে সাহায্য করে।
- ৫. সামাজিকীকরণ: পাঠক্রম শিক্ষার্থীকে সমাজের নিয়ম, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। দলগত কাজ, আলোচনা ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থী অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করতে এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে শেখে।
- ৬. নাগরিকত্বের বিকাশ: একটি কার্যকর পাঠক্রম শিক্ষার্থীকে অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে। এর ফলে শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজে ভূমিকা পালন করতে পারে।
- ৭. কর্মজীবনের প্রস্তুতি: পাঠক্রম শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করে। আধুনিক পাঠক্রমে যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, প্রযুক্তির ব্যবহার, সহযোগিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো জীবন ও কর্মদক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
- ৮. সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রকল্প, অনুসন্ধান, ব্যবহারিক কাজ এবং সমস্যা-ভিত্তিক শিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সৃজনশীল চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এতে শিক্ষার্থী নতুন পরিস্থিতিতে নিজের জ্ঞান প্রয়োগ করতে শেখে।
- ৯. সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিকাশ: পাঠক্রম একটি সমাজের ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্প, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়। একই সঙ্গে অন্যান্য সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার মনোভাবও গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
- ১০. শিক্ষককে নির্দেশনা প্রদান: পাঠক্রম শিক্ষককে শিক্ষাদানের জন্য একটি কাঠামো প্রদান করে। কোন বিষয় পড়াতে হবে, কোন পর্যায়ে কী দক্ষতা অর্জন করাতে হবে এবং শিক্ষার্থীর অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে—এসব বিষয়ে শিক্ষক পাঠক্রম থেকে নির্দেশনা পান।
- ১১. শিক্ষণ-শেখন প্রক্রিয়াকে সংগঠিত করা: পাঠক্রম শিক্ষণ-শেখন প্রক্রিয়াকে পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল করে। এর মাধ্যমে বিষয়বস্তু, শিক্ষণ-পদ্ধতি, শিক্ষণ-সহায়ক উপকরণ, কার্যক্রম এবং মূল্যায়নের মধ্যে সমন্বয় তৈরি হয়।
- ১২. ব্যক্তিগত পার্থক্য মোকাবিলা: শিক্ষার্থীদের মধ্যে বুদ্ধি, আগ্রহ, দক্ষতা ও শেখার গতির পার্থক্য রয়েছে। উপযুক্তভাবে পরিকল্পিত পাঠক্রম বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণের সুযোগ তৈরি করে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাকে উৎসাহিত করে।
- ১৩. জীবনযাপনের জন্য প্রস্তুত করা: শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন নয়; শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। পাঠক্রমের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনৈতিক সচেতনতা, যোগাযোগ, সামাজিক সম্পর্ক ও জীবনদক্ষতার মতো বিষয় শেখানো যায়।
- ১৪. মূল্যায়ন ও শিক্ষার মান উন্নয়ন: পাঠক্রমের সঙ্গে মূল্যায়নের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মূল্যায়নের ফলাফল থেকে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি এবং শিক্ষণ-শেখন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা বোঝা যায়। প্রয়োজনে পাঠক্রম, শিক্ষণ-পদ্ধতি ও কার্যক্রম সংশোধন করা যায়।
- ১৫. জাতীয় উন্নয়নে সহায়তা: শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও নাগরিক চেতনা বিকাশের মাধ্যমে পাঠক্রম জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখে। বিজ্ঞানমনস্কতা, উৎপাদনশীলতা, সামাজিক দায়িত্ব, পরিবেশ সচেতনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরির মাধ্যমে একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নত হয়।
2.1.4 শিক্ষার উপাদান হিসেবে বিদ্যালয়
শিক্ষার উপাদান হিসেবে বিদ্যালয় (School as a Factor of Education)
আদিম যুগে মানুষের জীবন ছিল সহজ ও সাধারণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা জটিল হয়ে ওঠে। নতুন নতুন জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন দেখা দেয়। ফলে শিশুদের শেখানোর জন্য শুধু পরিবার যথেষ্ট ছিল না। শিক্ষার পরিধি ধীরে ধীরে পরিবার থেকে বাইরে বিস্তৃত হয় এবং বিদ্যালয়ের সৃষ্টি হয়।
বিদ্যালয় হল এমন একটি সংগঠিত প্রতিষ্ঠান যেখানে নির্দিষ্ট বয়সের শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট বিষয় ও পাঠক্রম অনুসারে শিক্ষা গ্রহণ করে। এখানে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেন এবং প্রধান শিক্ষক, অন্যান্য কর্মচারী ও পরিচালনাকারীরা বিদ্যালয়ের কাজ পরিচালনা করেন। সহজভাবে বলা যায়, বিদ্যালয় হল এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে পরিকল্পিত ও নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও আচরণের বিকাশ ঘটানো হয়।
বিদ্যালয়ের সংজ্ঞা:
- ইংরেজি School শব্দটি গ্রিক শব্দ “Skhole” থেকে এসেছে। এর অর্থ অবসর সময়ে জ্ঞানচর্চা বা শিক্ষামূলক আলোচনা।
- বিদ্যালয় শুধু একটি ভবন নয়। এটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পাঠক্রম, নিয়মকানুন এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রম নিয়ে গঠিত একটি সংগঠিত প্রতিষ্ঠান।
- বিদ্যালয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হল শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করা এবং তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করে তোলা।
৩. বিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য
বিদ্যালয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল:
- ১. সংগঠিত প্রতিষ্ঠান- বিদ্যালয় একটি সংগঠিত প্রতিষ্ঠান। এখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রধান শিক্ষক এবং অন্যান্য কর্মচারী নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করেন।
- ২. নির্দিষ্ট শিক্ষালক্ষ্য – বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট শিক্ষাগত লক্ষ্য থাকে। শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটানো বিদ্যালয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য।
- ৩. নির্দিষ্ট পাঠক্রম – বিদ্যালয়ে একটি নির্দিষ্ট পাঠক্রম অনুসরণ করা হয়। সেই পাঠক্রম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয় শেখানো হয়।
- ৪. শিক্ষক ও শিক্ষার্থী – বিদ্যালয়ের প্রধান দুটি উপাদান হল শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। শিক্ষক শিক্ষা দেন এবং শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে শিক্ষা গ্রহণ করে।
- ৫. নিয়ম ও শৃঙ্খলা – বিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলা থাকে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।
- ৬. সামাজিক পরিবেশ – বিদ্যালয়ে বিভিন্ন পরিবার ও সামাজিক পরিবেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে। ফলে তারা অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে শেখে।
- ৭. শিক্ষামূলক কার্যক্রম – বিদ্যালয়ে শুধু পাঠ্যবই পড়ানো হয় না। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, বিজ্ঞান প্রদর্শনী, প্রকল্প ও বিভিন্ন সহ-পাঠক্রমিক কার্যক্রমও হয়।
- ৮. মূল্যায়ন ব্যবস্থা – শিক্ষার্থীরা কতটা শিখেছে তা জানার জন্য বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন করা হয়।
- ৯. সামাজিক প্রতিষ্ঠান – বিদ্যালয় সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এটি শিক্ষার্থীদের সমাজের উপযুক্ত ও দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে গড়ে তোলে।
- ১০. ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতি – বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা, কর্মজীবন এবং সামাজিক জীবনের জন্য প্রস্তুত করে।
বিদ্যালয়ের কার্যাবলি (Functions of School)
বিদ্যালয় সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। আধুনিক যুগে বিদ্যালয় শুধু শিক্ষার্থীদের বইয়ের জ্ঞান দেয় না; বরং তাদের ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, সামাজিকতা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের বিকাশেও সাহায্য করে।
বিদ্যালয়ের কার্যাবলি প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
(ক) শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক কার্যাবলি
(খ) সমাজ-কেন্দ্রিক কার্যাবলি
(ক) শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক কার্যাবলি
শিশু যখন প্রথম বিদ্যালয়ে আসে, তখন তার শারীরিক, মানসিক, আবেগীয়, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশ ধীরে ধীরে চলতে থাকে। বিদ্যালয় এই সব দিকের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১. বৌদ্ধিক বিকাশে সাহায্য
- বিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক বা জ্ঞানীয় বিকাশ ঘটানো।
- বর্তমান যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। তাই শিক্ষার্থীদের আধুনিক জ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতা অর্জন করা দরকার। বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, গণিত, ভাষা, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি বিষয় শেখানো হয়।
- শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পাঠাগার ব্যবহার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর চিন্তা, যুক্তি, কল্পনা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
২. ব্যক্তিত্বের বিকাশ
- বিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটানো।
- শুধু বইয়ের জ্ঞান অর্জন করলেই একজন শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে না। তার শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক শক্তি, আবেগ, সামাজিক আচরণ এবং নৈতিক গুণেরও বিকাশ দরকার।
- বিদ্যালয়ে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দলগত কাজ, আলোচনা এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।
৩. শিক্ষামূলক নির্দেশনা
- বর্তমানে বিভিন্ন স্তর থেকে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসে। তাদের সকলের শেখার ক্ষমতা ও প্রয়োজন এক নয়।
- বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষামূলক নির্দেশনা দেয়। কোন বিষয় কীভাবে পড়বে, কোন বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার এবং ভবিষ্যতে কীভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে—এসব বিষয়ে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সাহায্য করেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের শিক্ষাজীবনের জন্য সঠিক পথ বেছে নিতে পারে।
৪. বৃত্তিমূলক নির্দেশনা
বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন বা পেশা নির্বাচনে সাহায্য করে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর আগ্রহ, যোগ্যতা ও দক্ষতা এক নয়। কেউ শিক্ষক হতে চায়, কেউ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিল্পী বা অন্য কোনো পেশায় যেতে চায়। বিদ্যালয় শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও আগ্রহ বুঝতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যৎ পেশা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়।
৫. সৃজনশীল ক্ষমতার বিকাশ
প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মধ্যে কিছু না কিছু সৃজনশীল ক্ষমতা থাকে। বিদ্যালয়ের কাজ হল সেই ক্ষমতা খুঁজে বের করা এবং বিকশিত করা। চিত্রাঙ্কন, সংগীত, নৃত্য, গল্প লেখা, কবিতা লেখা, বিজ্ঞান প্রকল্প, হস্তশিল্প, বিতর্ক এবং অন্যান্য সহ-পাঠক্রমিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
৬. পাঠদান ও মূল্যায়ন
- বিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ের পাঠদান করা হয়। শিক্ষকরা নির্দিষ্ট পাঠক্রম অনুসারে শিক্ষার্থীদের পড়ান।
- শিক্ষার্থীরা কতটা শিখেছে তা জানার জন্য পরীক্ষা, মৌখিক প্রশ্ন, শ্রেণিকাজ, বাড়ির কাজ, প্রকল্প ও অন্যান্য পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হয়।
- মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শক্তি ও দুর্বলতা বোঝা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক অতিরিক্ত সাহায্যও করতে পারেন।
৭. নৈতিক ও চারিত্রিক বিকাশ
- বিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মধ্যে নৈতিকতা ও ভালো চরিত্র গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
- বিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে চলা, সময়মতো কাজ করা, শিক্ষক ও বড়দের সম্মান করা, সহপাঠীদের সাহায্য করা, সত্য কথা বলা এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর নৈতিক চেতনা তৈরি হয়।
- এর ফলে শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে একজন ভালো মানুষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হতে পারে।
(খ) সমাজ-কেন্দ্রিক কার্যাবলি
বিদ্যালয়ের কাজ শুধু শিক্ষার্থীর জীবনকে সুন্দর করা নয়; সমাজকেও সুন্দর ও উন্নত করে তোলা। বিদ্যালয় ভবিষ্যতের নাগরিক তৈরি করে। তাই সমাজের উন্নয়নেও বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
১. সামাজিকীকরণ
- প্রত্যেক সমাজের নিজস্ব নিয়ম, মূল্যবোধ, আচার-আচরণ ও রীতি রয়েছে। একজন শিশুকে সমাজের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হলে এই বিষয়গুলি জানতে হয়।
- বিদ্যালয়ে বিভিন্ন পরিবার ও পরিবেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে। তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলে, খেলাধুলা করে এবং দলগতভাবে কাজ করে।
- এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সহযোগিতা, সহনশীলতা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মান শেখে। এই প্রক্রিয়াকে সামাজিকীকরণ বলা হয়।
২. সংস্কৃতির সংরক্ষণ
প্রতিটি সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ রয়েছে। বিদ্যালয় এই সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়। বিদ্যালয়ে ইতিহাস, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প, উৎসব এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে। এইভাবে বিদ্যালয় সমাজের মূল্যবান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও রক্ষা করে।
৩. সংস্কৃতির উন্নয়ন
বিদ্যালয় শুধু পুরোনো সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করে না; বরং সমাজের সংস্কৃতির উন্নয়নেও সাহায্য করে। সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন চিন্তা, নতুন জ্ঞান ও নতুন মূল্যবোধ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়। বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ, মানবিকতা এবং আধুনিক চিন্তার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সমাজের উন্নতিতে ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ বিদ্যালয় পুরোনো ভালো দিকগুলি গ্রহণ করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করে।
৪. সংস্কৃতির সঞ্চালন
- এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
- পাঠ্যক্রম, পাঠ্যপুস্তক, সাহিত্য, ইতিহাস, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পুরোনো প্রজন্মের জ্ঞান ও সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়।
- এইভাবে বিদ্যালয় এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
৫. গণতান্ত্রিক বোধের উন্নয়ন
ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তৈরি করা বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নিয়ম, অধিকার, কর্তব্য, স্বাধীনতা, সমতা, ন্যায় এবং অন্যের মতামতের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখে। দলগত কাজ, আলোচনা, ছাত্র-নেতৃত্বাধীন কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মনোভাব তৈরি হয়।
৬. সমাজের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা
শিশু প্রথমে পরিবার থেকে শিক্ষা পায় এবং পরে বিদ্যালয়ে আসে। তাই বিদ্যালয়ের সঙ্গে পরিবার ও সমাজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা দরকার। অভিভাবক-শিক্ষক সভা, সামাজিক অনুষ্ঠান, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মসূচি এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যালয় সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। বিদ্যালয় ও সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে শিক্ষার্থীর উন্নয়ন আরও ভালোভাবে সম্ভব হয়।
৭. জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতার বিকাশ
- বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে শিক্ষা গ্রহণ করে। ফলে তাদের মধ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সহনশীলতার মনোভাব গড়ে ওঠে।
- জাতীয় ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম, দেশের সংবিধান এবং জাতীয় মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ তৈরি করে।
- একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়া হলে শিক্ষার্থীর মধ্যে আন্তর্জাতিকতার ধারণাও তৈরি হয়।
৫. বিদ্যালয়ের সামগ্রিক গুরুত্ব
- বিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শিক্ষার্থীর জ্ঞান বৃদ্ধি করে, চরিত্র গঠন করে, সামাজিক আচরণ শেখায় এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করে।
- একটি ভালো বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করে না; বরং তাদের ভালো মানুষ, দক্ষ ব্যক্তি এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
- বিদ্যালয় সমাজের অতীত সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করে, বর্তমান প্রজন্মকে শিক্ষিত করে এবং ভবিষ্যৎ সমাজের জন্য যোগ্য নাগরিক তৈরি করে।
সংক্ষিপ্তভাবে: বিদ্যালয় → জ্ঞান দেয় → ব্যক্তিত্ব গঠন করে → সামাজিকীকরণ ঘটায় → সংস্কৃতি সংরক্ষণ করে → গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে → ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরি করে।
2.3 শিক্ষার্থীর প্রেক্ষিত (Learners in Context: Situating Learner in the Socio-Political and Cultural Context)
শিক্ষার্থীকে শুধু একজন জ্ঞানগ্রহণকারী হিসেবে দেখলে তার শিক্ষাজীবনের সম্পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না। প্রত্যেক শিক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে ওঠে। এই পরিবেশ তার চিন্তাভাবনা, আচরণ, ভাষা, মূল্যবোধ, আগ্রহ, আত্মবিশ্বাস এবং শেখার পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও বিকাশ বুঝতে হলে তাকে তার সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হয়।
১. শিক্ষার্থীর সামাজিক প্রেক্ষিত (Socio Context of Learner)
শিক্ষার্থী যে সমাজে বসবাস করে, সেই সমাজ তার ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধু, বিদ্যালয়, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম—সবকিছু শিক্ষার্থীর সামাজিক পরিবেশের অংশ।
পরিবার
পরিবার হল শিশুর প্রথম শিক্ষার স্থান। পরিবারের সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষার প্রতি মনোভাব এবং পারিবারিক সম্পর্ক শিক্ষার্থীর শেখার ওপর প্রভাব ফেলে। যে পরিবারে বই পড়া, আলোচনা ও শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে শিশুর শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সহজে তৈরি হতে পারে। আবার অর্থনৈতিক সমস্যা, পারিবারিক অশান্তি বা শিক্ষার সুযোগের অভাব শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সামাজিক শ্রেণি ও অর্থনৈতিক অবস্থা
সব শিক্ষার্থীর আর্থিক অবস্থা এক নয়। কোনো শিক্ষার্থীর কাছে ব্যক্তিগত বই, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, কোচিং বা শান্ত পরিবেশে পড়ার সুযোগ থাকতে পারে; অন্য শিক্ষার্থীর এসব সুবিধা নাও থাকতে পারে। তাই একই শ্রেণিতে পড়লেও শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ সমান নাও হতে পারে। শিক্ষককে এই পার্থক্য বুঝে শিক্ষাদান করতে হবে।
সহপাঠী ও বন্ধুদের প্রভাব
কৈশোরে বন্ধু ও সহপাঠীদের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। বন্ধুদের আচরণ, মূল্যবোধ, ভাষা, আগ্রহ ও মনোভাব শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করতে পারে। দলগত কাজ ও সহযোগিতামূলক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অন্যের মতামতকে সম্মান করা, সহযোগিতা করা এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া শেখে।
২. রাজনৈতিক প্রেক্ষিত (Political Context of Learner)
শিক্ষা কখনো সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একটি দেশের সংবিধান, শিক্ষা-নীতি, সামাজিক ন্যায়, নাগরিক অধিকার এবং সরকারের শিক্ষাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে প্রভাবিত করে। ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাধীনতা, সমতা, ন্যায়, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং ভ্রাতৃত্ববোধের মতো সাংবিধানিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা অধিকার ও কর্তব্য, নিয়ম মেনে চলা, অন্যের মতামতের প্রতি সম্মান এবং গণতান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো বিষয় শেখে।
শিক্ষা নীতি ও সুযোগ
সরকারের শিক্ষা-নীতি বিদ্যালয়ের পাঠক্রম, শিক্ষার অধিকার, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষক নিয়োগ, বৃত্তি, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো এবং শিক্ষার সুযোগকে প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষার্থীকে তার রাজনৈতিক ও নীতিগত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বোঝা যায় না।
সামাজিক ন্যায় ও সমতা
সমাজে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, ভাষা, অর্থনৈতিক অবস্থা বা প্রতিবন্ধকতার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য দেখা যেতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল এই বৈষম্য কমানো এবং সকল শিক্ষার্থীর জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা।
৩. সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত (Cultural Context of Learner)
প্রত্যেক শিক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়। ভাষা, ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি, পোশাক, খাবার, উৎসব, সাহিত্য, সংগীত, লোকাচার, মূল্যবোধ এবং পারিবারিক ঐতিহ্য তার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। এই সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা ও শেখার ধরনকে প্রভাবিত করে।
ভাষা
ভাষা শিক্ষার্থীর শেখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ের শিক্ষার ভাষা যদি শিক্ষার্থীর পারিবারিক ভাষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়, তাহলে প্রথমদিকে তার শেখার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। তাই শিক্ষকের উচিত শিক্ষার্থীর ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করা এবং প্রয়োজনে পরিচিত ভাষা ও উদাহরণের সাহায্যে নতুন বিষয় বোঝানো।
সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ
পরিবার ও সমাজ থেকে শিক্ষার্থী বিভিন্ন মূল্যবোধ শেখে। যেমন—বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা, অতিথিকে সম্মান করা, সহযোগিতা করা, সামাজিক দায়িত্ব পালন করা ইত্যাদি। বিদ্যালয়ের উচিত শিক্ষার্থীর সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সম্মান করা এবং একই সঙ্গে তাকে বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য
একটি শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল ও সাংস্কৃতিক পটভূমির শিক্ষার্থী থাকতে পারে। এই বৈচিত্র্যকে সমস্যা হিসেবে না দেখে শিক্ষার সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। শিক্ষার্থীরা একে অপরের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারলে পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও ঐক্যের মনোভাব গড়ে ওঠে।
৪. শিক্ষার্থীর লিঙ্গ ও সামাজিক ভূমিকা
শিক্ষার্থীর লিঙ্গ সম্পর্কিত সামাজিক ধারণাও তার শিক্ষাকে প্রভাবিত করতে পারে। অনেক সমাজে এখনও কিছু পেশা, বিষয় বা কাজকে ছেলে বা মেয়ের জন্য আলাদা করে দেখা হয়। যেমন, বিজ্ঞান বা গণিত শুধু ছেলেদের জন্য এবং শিল্প বা গৃহস্থালি কাজ শুধু মেয়েদের জন্য—এই ধরনের ধারণা শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। বিদ্যালয়ের উচিত শিক্ষার্থীদের লিঙ্গসমতা সম্পর্কে সচেতন করা এবং প্রত্যেককে নিজের আগ্রহ ও যোগ্যতা অনুযায়ী বিকাশের সুযোগ দেওয়া।
৫. ধর্ম ও শিক্ষার্থীর প্রেক্ষিত
শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধর্মীয় ও বিশ্বাসের পরিবার থেকে বিদ্যালয়ে আসে। তাদের ধর্মীয় পরিচয় ও পারিবারিক মূল্যবোধকে সম্মান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের পরিবেশ এমন হওয়া উচিত যেখানে কোনো শিক্ষার্থী ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার না হয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মনোভাব গড়ে তোলা দরকার।
৬. গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীর পার্থক্য
গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা অনেক সময় আলাদা হয়। শহরের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের বেশি সুযোগ পেতে পারে। অন্যদিকে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রকৃতি, কৃষি ও স্থানীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্ক বেশি থাকতে পারে। এই পার্থক্যকে শিক্ষার্থীর যোগ্যতার পার্থক্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং শিক্ষকের উচিত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা।
৭. গণমাধ্যম ও ডিজিটাল সংস্কৃতির প্রভাব
বর্তমান শিক্ষার্থীরা টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, সামাজিক মাধ্যম, YouTube, অনলাইন ক্লাস এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিপুল তথ্য পায়। এর ফলে শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ভুল তথ্য, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার, অনলাইন আসক্তি, সাইবার বুলিং এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের প্রভাবের মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল সাক্ষরতা ও তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা শেখানো গুরুত্বপূর্ণ।