Educational Philosophy of Mahatma Gandhi বা মহাত্মা গান্ধীর শিক্ষাদর্শন(Basic Education of Mahatma Gandhi/গান্ধীর বুনিয়াদি শিক্ষা) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করুন। বুনিয়াদি শিক্ষা, নাই-তালিম, শিক্ষার উদ্দেশ্য, কর্মভিত্তিক শিক্ষা, মাতৃভাষায় শিক্ষা, চরিত্র গঠন ও সর্বাঙ্গীণ বিকাশসহ গান্ধীর শিক্ষাচিন্তা সহজ বাংলায় জানুন। D.El.Ed ও B.Ed পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নোট।
মহাত্মা গান্ধীর বুনিয়াদি শিক্ষা (Basic Education)
ভূমিকা
ভারতীয় শিক্ষাচিন্তার ইতিহাসে মহাত্মা গান্ধীর বুনিয়াদি শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক অবদান। ব্রিটিশ শাসনকালে প্রচলিত শিক্ষা ছিল প্রধানত পুথিনির্ভর, পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। এই শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শ্রমবিমুখ করে তুলত এবং চাকরির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াত। গান্ধীজি এমন শিক্ষার পরিকল্পনা করেন, যা শিশুর সর্বাঙ্গীণ বিকাশ ঘটাবে এবং তাকে আত্মনির্ভর, নৈতিক ও সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। তাঁর এই শিক্ষাপরিকল্পনা ‘বুনিয়াদি শিক্ষা’, ‘নঈ তালিম’ বা ‘ওয়ার্ধা শিক্ষাপরিকল্পনা’ নামে পরিচিত।
বুনিয়াদি শিক্ষার অর্থ
‘বুনিয়াদি’ শব্দের অর্থ ভিত্তিমূলক বা মৌলিক। যে শিক্ষা শিশুর জীবন, সামাজিক পরিবেশ এবং উৎপাদনমূলক কাজকে ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, তাকে বুনিয়াদি শিক্ষা বলা হয়। এখানে কোনো উপযোগী হস্তশিল্প বা উৎপাদনমূলক কাজকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিষয় শেখানো হয়।
গান্ধীজির মতে, শিক্ষা হলো শিশু ও মানুষের দেহ, মন ও আত্মার শ্রেষ্ঠ গুণগুলির সর্বাঙ্গীণ বিকাশ। তাই শুধু সাক্ষরতা অর্জনকে তিনি প্রকৃত শিক্ষা মনে করতেন না। তাঁর শিক্ষাভাবনায় মস্তিষ্ক, হৃদয় ও হাতের সমন্বিত বিকাশ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি
দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিনিক্স বসতি ও টলস্টয় ফার্মে গান্ধীজি শিক্ষা, শ্রম এবং সমবায়ভিত্তিক জীবনযাপনের বিভিন্ন পরীক্ষা করেন। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর বুনিয়াদি শিক্ষাচিন্তাকে প্রভাবিত করে।
১৯৩৭ সালের অক্টোবর মাসে ওয়ার্ধায় অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে তিনি বুনিয়াদি শিক্ষার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ড. জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি বুনিয়াদি শিক্ষার বিস্তারিত পাঠক্রম ও কার্যপদ্ধতি প্রস্তুত করে। এর মাধ্যমে ভারতীয় জীবন ও সংস্কৃতির উপযোগী একটি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বুনিয়াদি শিক্ষার মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্য
১. অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা
গান্ধীজি ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সি সব শিশুর জন্য সাত বছরের অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলেন। জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা আর্থিক অবস্থার কারণে কোনো শিশু যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটিই ছিল উদ্দেশ্য।
২. মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা
মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। শিশুর চিন্তা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা মাতৃভাষায় স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হয়। ফলে বিষয়বস্তু বোঝা সহজ হয় এবং শিক্ষা নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকে।
৩. হস্তশিল্পকেন্দ্রিক শিক্ষা
কৃষিকাজ, সুতো কাটা, বয়ন, কাঠের কাজ বা মাটির কাজের মতো কোনো উপযোগী শিল্পকে শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করা হয়। শিল্পের নির্বাচন হবে স্থানীয় পরিবেশ, শিশুর বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী।
তবে হস্তশিল্প কেবল আলাদা একটি বিষয় নয়; এটি অন্যান্য বিষয় শেখানোর মাধ্যম। উদ্দেশ্য শিশুকে শুধু কারিগর তৈরি করা নয়, কাজের মধ্য দিয়ে তার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো।
৪. কর্মের মাধ্যমে শিক্ষা
শিশু নিজে কাজ করবে, পর্যবেক্ষণ করবে, সমস্যার মুখোমুখি হবে এবং সমাধান খুঁজবে। এই সক্রিয় প্রক্রিয়ায় অর্জিত জ্ঞান অধিক অর্থবহ ও স্থায়ী হয়। তাই মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৫. সমন্বয় বা অনুবন্ধ নীতি
বুনিয়াদি শিক্ষায় বিভিন্ন বিষয়কে বিচ্ছিন্নভাবে না শিখিয়ে শিল্প, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে শেখানো হয়।
যেমন, বাগান করার সময় জমির পরিমাপ থেকে গণিত, উদ্ভিদের বৃদ্ধি থেকে বিজ্ঞান এবং কাজের বিবরণ লেখা থেকে ভাষা শেখানো যায়। এভাবে একটি কাজের সঙ্গে একাধিক বিষয়ের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
৬. স্বাবলম্বনের নীতি
গান্ধীজি আশা করেছিলেন, শিক্ষার্থীদের উৎপাদিত সামগ্রী বিক্রির মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ব্যয়ের অন্তত কিছু অংশ নির্বাহ করা সম্ভব হবে। এতে বিদ্যালয়ের আর্থিক নির্ভরতা কমবে এবং শিক্ষার্থীরা উৎপাদন ও অর্থনীতির বাস্তব ধারণা পাবে।
তবে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন নয়। উৎপাদনের চাপ যেন শিশুর শেখা, আনন্দ ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
৭. জীবন ও সমাজের সঙ্গে সংযোগ
পাঠক্রমে স্থানীয় জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, গ্রামীণ সমস্যা এবং সমাজসেবাকে স্থান দেওয়া হয়। ফলে বিদ্যালয় সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে না; বরং সামাজিক উন্নতির সক্রিয় কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
৮. অহিংসা ও সহযোগিতা
প্রতিযোগিতা ও স্বার্থপরতার পরিবর্তে পারস্পরিক সাহায্য, সহমর্মিতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কাজের মধ্য দিয়ে এসব মূল্যবোধের অনুশীলন ঘটে।
পাঠক্রম
বুনিয়াদি শিক্ষার পাঠক্রম ছিল কর্মভিত্তিক, সমন্বিত ও জীবনমুখী। এর প্রধান উপাদানগুলি হলো—
- স্থানীয়ভাবে উপযোগী হস্তশিল্প বা উৎপাদনমূলক কাজ।
- মাতৃভাষা ও ভাষাচর্চা।
- দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় গণিত।
- প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ।
- ইতিহাস, ভূগোল ও সামাজিক জীবনসংক্রান্ত জ্ঞান।
- সংগীত, চিত্রাঙ্কন ও সৃজনশীল কাজ।
- শারীরশিক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা।
- সমাজসেবা ও নৈতিক আচরণের অনুশীলন।
এই বিষয়গুলিকে যথাসম্ভব পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত করে শেখানো হতো।
শিক্ষণপদ্ধতি ও শিক্ষকের ভূমিকা
বুনিয়াদি শিক্ষায় কাজ, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, আলোচনা এবং সমস্যা সমাধানভিত্তিক পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী এখানে নিষ্ক্রিয় শ্রোতা নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। দলগত কাজের মাধ্যমে তার সহযোগিতা ও নেতৃত্বের ক্ষমতা গড়ে ওঠে।
শিক্ষক হবেন পথপ্রদর্শক, সহকর্মী ও আদর্শ চরিত্রের অধিকারী। তাঁকে বিষয়জ্ঞান, শিশুমনস্তত্ত্ব এবং নির্বাচিত শিল্পে দক্ষ হতে হবে। শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ নির্বাচন এবং কাজের সঙ্গে পাঠ্যবিষয়ের স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বুনিয়াদি শিক্ষার প্রশংসনীয় দিক (গুণাবলি)
গান্ধীর বুনিয়াদি শিক্ষার ধারণা অনেক ক্ষেত্রে যুগোপযোগী ও প্রশংসনীয়। এর গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিকগুলি নিম্নরূপ—
(ক) জীবনমুখী ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা
গান্ধীজি শিক্ষা ও জীবনের মধ্যে বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মতে, বিদ্যালয়ে শেখানো জ্ঞান দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগাতে পারা উচিত। বুনিয়াদি শিক্ষায় এই নীতির প্রয়োগ ঘটেছে। কাজের মাধ্যমে শেখানোর ধারণা আজকের ক্রিয়ামূলক শিক্ষা (Activity-based Learning) ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষণের (Experiential Learning)-এর সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।
(খ) সর্বাঙ্গীণ বিকাশের ওপর জোর
বুনিয়াদি শিক্ষা কেবল বৌদ্ধিক বিকাশেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিশুর দেহ, মন, হৃদয় ও হাত – এই চারটির সমন্বিত বিকাশ ঘটাতে চেয়েছে। গান্ধীজি যাকে বলতেন, ‘মস্তিষ্ক, হৃদয় ও হাতের সমন্বয়’। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষাকে পূর্ণাঙ্গ ও মানবিক করে তোলে।
(গ) শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা
ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের কায়িক শ্রমকে ছোটো ও হেয় করে দেখাত। গান্ধীজি প্রথমবার ভারতীয় শিক্ষায় উৎপাদনমূলক কাজকে মর্যাদাপূর্ণ স্থান দেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, কৃষিকাজ, বয়ন, সুতো কাটা প্রভৃতি কাজের মধ্যেও শিক্ষার সুযোগ রয়েছে এবং শ্রমজীবী মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখাও শিক্ষা হওয়া উচিত।
(ঘ) গণমুখী, সহজলভ্য ও অবৈতনিক শিক্ষা
গান্ধীজি ৭–১৪ বছর বয়সী সকল শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলেছিলেন। মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে তিনি শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তুলতে চেয়েছিলেন। এর ফলে ধনীরা ও গরিবরা, শহর ও গ্রাম; সবার জন্য একই ধরনের শিক্ষার সুযোগ তৈরি হতো।
(ঙ) আত্মনির্ভরতা ও স্বাবলম্বন
বুনিয়াদি শিক্ষায় শিশুকে আত্মনির্ভর করে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যালয়ে উৎপাদনমূলক কাজের মাধ্যমে কিছু আয় করা সম্ভব হবে—এই চিন্তা শিক্ষার্থীকে কেবল ভরণপোষণের ওপর নির্ভরশীল না করে আত্মনির্ভরশীল হতে শেখায়। এছাড়া এই নীতির মাধ্যমে বিদ্যালয়কে রাষ্ট্র বা দাতাদের ওপর একান্ত নির্ভরশীল না করে কিছুটা আর্থিক স্বাবলম্বনেও সহায়তা করতে চাওয়া হয়েছিল।
(চ) সমাজ ও পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ
গান্ধীর বুনিয়াদি শিক্ষা বিদ্যালয়কে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। বরং বিদ্যালয়কে সমাজের জীবন্ত অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। গ্রামীণ জীবনকেন্দ্রিক এই শিক্ষা স্থানীয় চাহিদা, পরিবেশ, কৃষি, স্বাস্থ্য ইত্যাদির সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করেছে। এই দিক থেকে বুনিয়াদি শিক্ষা একান্তভাবেই সমাজমুখী।
(ছ) চরিত্রগঠন ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব
বুনিয়াদি শিক্ষার মাধ্যমে শুধু জ্ঞান নয়, সত্য, অহিংসা, সততা, সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ প্রভৃতি নৈতিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানোর কথা বলা হয়েছে। গান্ধীজি মনে করতেন, চরিত্রহীন জ্ঞান সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই তিনি জ্ঞানার্জনের সঙ্গে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন।
এসব দিক বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর শিক্ষাধারণাটি শিশুকেন্দ্রিক, জীবনমুখী ও সমাজসেবামূলক হওয়ায় অনেকাংশেই প্রশংসনযোগ্য।
২. বুনিয়াদি শিক্ষার সমালোচনামূলক দিক (দুর্বলতা ও সমালোচনা)
গান্ধীর বুনিয়াদি শিক্ষা ধারণা যতই মহৎ হোক না কেন, বাস্তবায়ন ও তাত্ত্বিক দিক থেকে এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা রয়েছে। সমকালীন ও পরবর্তী শিক্ষাবিদরা এই শিক্ষাপরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন।
(ক) হস্তশিল্পের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব
বুনিয়াদি শিক্ষার প্রধান সমালোচনা হলো: এতে উৎপাদনমূলক কাজ বা হস্তশিল্পকে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু করে রাখা হয়েছে। অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, শিক্ষা মূলত বিকাশের মাধ্যম হওয়া উচিত, উৎপাদনের মাধ্যম নয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি মনে করতেন, শিশুর কাজ যেন আনন্দের জন্য হয়, আর্থিক লাভের জন্য নয়। ঠাকুর আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, বিদ্যালয়কে যদি কারখানা করে তোলা হয়, তবে শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল ও সৃজনশীলতা চাপা পড়তে পারে।
(খ) কৃত্রিম সমন্বয় নীতি
গান্ধীজি ‘সমন্বয় নীতি’ (Correlation)-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, একটি হস্তশিল্পের মধ্য দিয়েই ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান, ভূগোল প্রভৃতি সব বিষয় শেখানো হোক। কিন্তু বাস্তবে সব বিষয়কে জোর করে একটি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা প্রায়শই কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।
উদাহরণস্বরূপ, সুতো কাটার কাজের সঙ্গে ইতিহাস বা ভূগোলকে সবসময় স্বাভাবিকভাবে যুক্ত করা সম্ভব নয়। এতে বিষয়বস্তুর সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক জ্ঞান দেওয়া ব্যাহত হতে পারে বলে অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন।
(গ) বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আধুনিক জ্ঞানের উপেক্ষা
বুনিয়াদি শিক্ষায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, পরীক্ষামূলক কাজ ও আধুনিক প্রযুক্তির যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে সমালোচনা করা হয়। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ছিলেন গান্ধীর বুনিয়াদি শিক্ষার অন্যতম সমালোচক।
নেহরু মনে করতেন, গান্ধীজি অতিরিক্তভাবে গ্রামীণ জীবন ও অতীতকে আদর্শায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ভারতকে কেবল গ্রামোন্নয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে ভবিষ্যতের শিল্পায়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা হয়েছে বুনিয়াদি শিক্ষায়। নেহরুর মতে, আধুনিক যুগে ভারতের উন্নতির জন্য বৈজ্ঞানিক মনোভাব ও উচ্চ প্রযুক্তিগত জ্ঞান অপরিহার্য।
(ঘ) গ্রামকেন্দ্রিকতার একচেটিয়া দৃষ্টিভঙ্গি
গান্ধীজি বুনিয়াদি শিক্ষাকে মূলত গ্রামীণ জীবনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এতে শহুরে শিশুদের প্রয়োজন, আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের দিকটি পর্যাপ্তভাবে বিবেচনা করা হয়নি। শহরে বসবাসকারী শিশুর পক্ষে কৃষি বা গ্রামীণ হস্তশিল্প সব সময় উপযোগী নাও হতে পারে। তাই বুনিয়াদি শিক্ষাকে সর্বভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে প্রয়োগ করা কিছুটা একপেশে মনে হয়।
(ঙ) আর্থিক স্বাবলম্বনের ভুল ব্যাখ্যা
গান্ধীজি আশা করেছিলেন, বিদ্যালয়ের উৎপাদিত সামগ্রী বিক্রি করে বিদ্যালয়ের ব্যয় মেটানো যাবে। এই ‘স্বাবলম্বন নীতি’ নিয়ে গুরুতর সমালোচনা হয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, শিশুদের উৎপাদনশ্রমকে বিদ্যালয়ের আর্থিক লাভের উৎস করা উচিত নয়।
শিশুর প্রধান কাজ হলো শেখা ও বিকাশ ঘটানো। উৎপাদনে চাপ দিলে কাজটি তার বিকাশের উপকরণ না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া ছোটো বাচ্চাদের তৈরি পণ্য বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকবে কি না, সেটাও বাস্তবিকভাবে সন্দেহজনক। তাই এই আর্থিক দিকটিকে অনেকেই বুনিয়াদি শিক্ষার সবচেয়ে দুর্বল অংশ বলে মনে করেন।
(চ) উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তিমূলক ধারাবাহিকতার অভাব
বুনিয়াদি শিক্ষা ৭–১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সাত বছরের বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলেছে। কিন্তু এর পরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কীভাবে সংযোগ থাকবে, সে সম্পর্কে গান্ধীজি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেননি। ফলে এই শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষিত শিশুরা উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশল ইত্যাদি ক্ষেত্রে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে কি না—এই প্রশ্ন উঠেছে।
ড. এস. রাধাকৃষ্ণান কমিশন (১৯৪৮–৪৯)ও মনে করেছিল, বুনিয়াদি শিক্ষার পরে উপযুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার পথ নিশ্চিত না থাকলে এটি অনেক শিশুকে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
(ছ) স্বাধীন চিন্তা ও সমালোচনামূলক বুদ্ধির পর্যাপ্ত স্থান নেই
গান্ধীজি নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও চরিত্রগঠনের ওপর জোর দিলেও, বুনিয়াদি শিক্ষায় সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical Thinking), প্রশ্ন তোলা ও যুক্তিনির্ভর বিতর্কের ততটা গুরুত্ব দেখা যায় না। বিদ্যালয়ে কাজ ও অনুশীলনের ওপর জোর থাকলেও, শিশুকে প্রচলিত রীতিনীতি, বিশ্বাস বা সামাজিক কুসংস্কারের সমালোচনা করে ভাবতে শেখানোর সুযোগ যথেষ্ট ছিল কি না—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে শুধু আনুগত্যশীল নয়, আত্মমর্যাদাশীল, প্রশ্নকারী ও পরিবর্তনকামী নাগরিক গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। এই দিক থেকে বুনিয়াদি শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা রক্ষণশীল বলেই মনে করা হয়।
সমালোচনামূলক মূল্যায়ন (সামগ্রিক বিচারে)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, মহাত্মা গান্ধীর বুনিয়াদি শিক্ষা ধারণাটি একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজনের ফলে উদ্ভূত একটি প্রতিক্রিয়াশীল ও সংস্কারমূলক শিক্ষাচিন্তা ছিল।
ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা ভারতকে বিদেশিনির্ভর, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও শ্রমবিমুখ করে তুলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে গান্ধীজি যে শিক্ষার প্রস্তাব দেন, তা ছিল অত্যন্ত সাহসী, দেশজ ও গণতান্ত্রিক। তিনি শিক্ষাকে জনসাধারণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, শ্রমকে সম্মান দিতে চেয়েছিলেন এবং শিক্ষা ও জীবনকে একসূত্রে গাঁথতে চেয়েছিলেন; এই তিনটি মহান অবদান কখনোই অস্বীকার করা যায় না।
তবে সময় ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার কিছু নীতির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। গান্ধীজি গ্রামীণ স্বয়ংসম্পূর্ণতার আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনোত্তর ভারত শিল্পায়ন, urbanization, বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির দিকে এগোতে চেয়েছিল। তাই বুনিয়াদি শিক্ষার একান্ত গ্রামকেন্দ্রিক ও হস্তশিল্পকেন্দ্রিক রূপকে আজকের বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থার একমাত্র আদর্শ বলা যায় না।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: গান্ধীর শিক্ষার মূল আদর্শ বা দর্শন (শ্রমের মর্যাদা, জীবনমুখিতা, মাতৃভাষা, সর্বাঙ্গীণ বিকাশ, আত্মনির্ভরতা) আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তাঁর প্রস্তাবিত কাঠামো বা পদ্ধতির কিছু অংশ (বিশেষ করে শিল্পকেন্দ্রিক সমন্বয় ও আর্থিক স্বাবলম্বনের নীতি) বাস্তব ও আধুনিক প্রেক্ষাপটে সমালোচনার যোগ্য।