গল্প বলার পদ্ধতি (Storytelling Method of Teaching)

গল্প বলার পদ্ধতি (Storytelling Method of Teaching) হলো এমন একটি শিক্ষণ-পদ্ধতি, যেখানে গল্প, কাহিনি, ঘটনা, চরিত্র ও সংলাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে কোনো বিষয় বা ধারণা উপস্থাপন করা হয়। গল্প মানুষের স্বাভাবিক আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি করে। তাই গল্পের মাধ্যমে কঠিন ও বিমূর্ত বিষয়কেও সহজ, আনন্দদায়ক এবং স্মরণীয় করে শেখানো যায়।

এই পদ্ধতিতে শিক্ষক শুধু তথ্য প্রদান করেন না; বরং একটি কাহিনির ধারাবাহিকতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে তাদের চিন্তা, কল্পনা, অনুভূতি ও মূল্যবোধকে সক্রিয় করেন।

Storytelling Method বলতে এমন একটি শিক্ষণ-পদ্ধতিকে বোঝায় যেখানে কোনো শিক্ষাগত বিষয়, ধারণা, ঘটনা বা মূল্যবোধকে গল্পের কাঠামো ও বর্ণনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন করা হয়, যাতে তারা আগ্রহের সঙ্গে বিষয়টি বুঝতে ও মনে রাখতে পারে।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ভূমিকা

শিক্ষকশিক্ষার্থী
উপযুক্ত গল্প নির্বাচন করেনমনোযোগ দিয়ে গল্প শোনে
গল্পের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেনপ্রশ্নের উত্তর দেয়
আকর্ষণীয়ভাবে গল্প বলেনকল্পনা ও চিন্তা করে
প্রশ্ন করেনঅনুমান ও মতামত প্রকাশ করে
আলোচনা পরিচালনা করেনআলোচনায় অংশগ্রহণ করে
শিক্ষণীয় বিষয় ব্যাখ্যা করেনমূল বিষয় শনাক্ত করে
মূল্যায়ন করেনগল্প পুনর্বর্ণনা/প্রয়োগ করে

প্রাথমিক স্তরে EVS, ভাষা, গণিত ও শিল্পকলাকে সমন্বিত করে গল্প বলা পদ্ধতিতে পাঠদান

প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা গল্প শুনতে, ছবি দেখতে, গান গাইতে, অভিনয় করতে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে ভালোবাসে। তাই Storytelling Method বা গল্প বলা পদ্ধতি প্রাথমিক শিক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। একটি উপযুক্ত গল্পের মাধ্যমে একই সঙ্গে পরিবেশবিদ্যা (EVS), ভাষা, গণিত এবং শিল্পকলার বিভিন্ন শিক্ষণফল অর্জন করা সম্ভব।

এখানে একটি সমন্বিত গল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কীভাবে সক্রিয়ভাবে পাঠে অংশগ্রহণ করানো যায় তা দেখানো হলো।

সমন্বিত গল্প: মিতার বাগানে এক আনন্দের দিন

একদিন সকালে মিতা তার দাদুর সঙ্গে বাড়ির পাশের বাগানে গেল। বাগানে গিয়ে সে দেখল: চারদিকে সবুজ গাছ, রঙিন ফুল, পাখি ও প্রজাপতি।

মিতা গুনতে শুরু করল:

“দাদু, এখানে ৫টি গোলাপ, ৪টি গাঁদা আর ৩টি জবা ফুল আছে!”

দাদু হাসলেন। তিনি বললেন,
“তাহলে বলো তো, সব মিলিয়ে কতটি ফুল?”

মিতা আঙুলে গুনে বলল:

“৫ + ৪ + ৩ = ১২টি ফুল!”

হঠাৎ একটি প্রজাপতি উড়ে এসে একটি ফুলের ওপর বসল। মিতা বলল,
“দাদু, প্রজাপতিটি কত সুন্দর! এর ডানায় কী সুন্দর নকশা!”

দাদু বললেন: “প্রজাপতি ও ফুল আমাদের পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফুল থেকে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে এবং অনেক গাছের পরাগায়নে সাহায্য করে।”

এরপর মিতা দেখতে পেল, একটি গাছের নিচে কিছু প্লাস্টিকের প্যাকেট পড়ে আছে। সে বলল,
“দাদু, এগুলো এখানে কেন? এগুলো তো পরিবেশ নোংরা করছে!”

দাদু বললেন: “ঠিক বলেছ। আমাদের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা উচিত। প্লাস্টিক যেখানে-সেখানে ফেলা উচিত নয়।”

মিতা একটি ঝুড়ি নিয়ে প্লাস্টিকের প্যাকেটগুলো সংগ্রহ করল। সে মোট ৮টি প্যাকেট পেল। তার বন্ধু রাহুলও সেখানে এল এবং আরও ৭টি প্যাকেট সংগ্রহ করল।

মিতা বলল:

“তাহলে আমরা মোট কতটি প্যাকেট সংগ্রহ করেছি?”

রাহুল বলল:

“৮ + ৭ = ১৫টি!”

দুজন মিলে প্যাকেটগুলো নির্দিষ্ট বর্জ্যপাত্রে ফেলে দিল।

এরপর তারা বাগানে একটি ছোট্ট চারা গাছ লাগাল। মিতা মাটি খুঁড়ল, রাহুল চারা বসাল এবং দাদু জল দিলেন।

দাদু বললেন:

“গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, ছায়া দেয় এবং পরিবেশকে সুন্দর রাখে। তাই গাছকে ভালোবাসতে হবে।”

মিতা আনন্দে বলল,
“আমরা গাছের যত্ন নেব!”

তারপর মিতা ও রাহুল একটি ছোট গান গাইতে শুরু করল:

“গাছ লাগাই, গাছ বাঁচাই,
সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলি।
ময়লা ফেলব না যেখানে-সেখানে,
পরিষ্কার রাখব চারপাশখানি।”

গান শুনে দাদু হাততালি দিলেন। সবাই মিলে বাগানে একটি সবুজ উৎসব করল।

মিতা ফুলের ছবি আঁকল, রাহুল প্রজাপতির ছবি আঁকল এবং অন্য বন্ধুরা গাছ, পাখি ও সূর্যের ছবি আঁকল।

দিনের শেষে মিতা বলল:

“আজ আমরা শুধু গল্প শুনিনি; আমরা পরিবেশকে চিনেছি, গণিত করেছি, নতুন শব্দ শিখেছি, গান গেয়েছি এবং ছবি এঁকেছি!”

দাদু হেসে বললেন:

“এটাই হলো আনন্দের সঙ্গে শেখা।”

গল্পটির মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয়

বিষয়গল্পের উপাদানশিক্ষণীয় বিষয়
EVSগাছ, ফুল, প্রজাপতি, পাখি, বর্জ্য, পরিবেশজীবজগৎ, উদ্ভিদ, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ
Languageগল্প, সংলাপ, নতুন শব্দ, গানশ্রবণ, কথন, শব্দভাণ্ডার, বাক্য গঠন
Mathematics৫+৪+৩, ৮+৭গণনা, যোগ, সংখ্যা ধারণা
Performing Artগান, অভিনয়, অঙ্গভঙ্গিঅভিনয়, rhythm, expression, creativity
Visual Artফুল, প্রজাপতি, গাছ আঁকাDrawing, colour, creativity

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top