West Bengal D.El.Ed Part II-এর CC-02: EDUCATIONAL STUDIES-এর Unit-6: Education Politics and Society অধ্যায়ের বাংলা নোটস শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা, রাজনীতি ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং শিক্ষাব্যবস্থায় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে ধারণা গড়ে তুলতে সহায়ক।
এই অধ্যায়ে আলোচিত বিষয়গুলি D.El.Ed Part II-এর Paper 02, EDUCATIONAL STUDIES-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। D.El.Ed notes in Bengali হিসেবে সাজানো এই নোটগুলিতে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ধারণাগুলি বুঝে পড়তে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষার উত্তরে ব্যবহার করতে পারে।
Unit-6-এর বিষয়গুলি পড়ার সময় শিক্ষা কীভাবে সমাজের সঙ্গে যুক্ত, সামাজিক পরিবর্তন, মূল্যবোধ, সমতা, নেতৃত্ব, বিদ্যালয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং শিক্ষার উপর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের মতো বিষয়গুলি সুস্পষ্টভাবে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এই অধ্যায়ের বিস্তারিত নোট শিক্ষার্থীদের সংজ্ঞা, মূল ধারণা, গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং পরীক্ষায় আলোচনাযোগ্য বিষয়গুলি ধারাবাহিকভাবে পুনরালোচনা করতে সাহায্য করবে।
WBStudent.in-এ প্রকাশিত এই West Bengal D.El.Ed নোটগুলি বিশেষভাবে D.El.Ed Part II-এর শিক্ষার্থীদের exam preparation সহজ করার উদ্দেশ্যে তৈরি, যাতে পাঠ্যবিষয় বোঝার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর লেখার জন্য প্রয়োজনীয় ধারণাও তৈরি হয়।
Table of Contents
Toggle- Political nature of Education
- Role of Education in reproducing dominance and challenging marginalization with reference to class, caste, Gender and Religion
- Teacher and Society: A critical appraisal of teachers’ status
Political Nature of Education
শিক্ষার রাজনৈতিক প্রকৃতি আলোচনা করতে শিক্ষার রাজনৈতিক কার্যাবলি, রাজনৈতিক লক্ষ্য, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভূমিকা, গণতান্ত্রিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ প্রভৃতি বিষয় বিবেচনা করা হয়।
১. শিক্ষার রাজনৈতিক কার্যাবলি Political Functions of Education
- ১. সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণ: শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কাজ হলো রাষ্ট্রের প্রত্যেক শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। শিক্ষিত নাগরিক তৈরি হলে তারা রাষ্ট্রের উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। তাই সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
- ২. জাতীয় সংহতি ও ঐক্য সৃষ্টি: শিক্ষা মানুষের মধ্যে জাতীয় জীবনের প্রতি সংহতি ও ঐক্যের অনুভূতি গড়ে তোলে। দেশের প্রতি গভীর মনোভাব শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে তোলার মাধ্যমে শিক্ষা জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক সংহতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- ৩. সুনাগরিক সৃষ্টি: শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কাজ হলো দেশের উপযুক্ত ও আদর্শ নাগরিক তৈরি করা। শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির মধ্যে দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে ওঠে। ফলে তারা রাষ্ট্রের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
- ৪. নাগরিক অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা: শিক্ষা নাগরিকদের রাষ্ট্রের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে। একজন সচেতন নাগরিক নিজের অধিকার সম্পর্কে জানার পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে পারে।
- ৫. দক্ষ জনশক্তির বিকাশ: শিক্ষার মাধ্যমে রাজনৈতিক সচেতনতা, অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান দিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যায়। দক্ষ ও সচেতন জনশক্তি দেশের নিরাপত্তা, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- ৬. রাজনৈতিক বোধ ও দূরদৃষ্টির বিকাশ: রাষ্ট্রের অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। শিক্ষা মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক বোধ, বিচারবুদ্ধি ও দূরদৃষ্টির বিকাশ ঘটায়। এর ফলে যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে।
২. শিক্ষার রাজনৈতিক লক্ষ্য Political Aims of Education
- ১. রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি: শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক চেতনা ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
- ২. গণতান্ত্রিক মনোভাবের বিকাশ: গণতান্ত্রিক শিক্ষার মাধ্যমে পরিবার ও বৃহত্তর সামাজিক ক্ষেত্রে সহনশীলতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের মনোভাব গড়ে তোলা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
- ৩. গণতান্ত্রিক মানসিক গুণাবলির বিকাশ: রাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও মানসিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানো শিক্ষার অন্যতম রাজনৈতিক লক্ষ্য। এর মাধ্যমে ব্যক্তির মধ্যে স্বাধীন চিন্তা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি হয়।
- ৪. রাষ্ট্রের উন্নয়নে সক্ষম নাগরিক তৈরি: শিক্ষার রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো এমন মানুষ তৈরি করা যারা নিজের, সমাজের এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। শিক্ষা ব্যক্তিকে দায়িত্বশীল ও কর্মক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
- ৫. উপযুক্ত নেতৃত্ব গড়ে তোলা: শিক্ষা ব্যক্তির সর্বাঙ্গীণ বিকাশ ঘটিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপযুক্ত নেতৃত্ব গড়ে তুলতে সাহায্য করে। রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে সঠিক নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয়।
- ৬. আদর্শ নাগরিক তৈরি: রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করতে সক্ষম আদর্শ নাগরিক তৈরি করা শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য। শিক্ষা নাগরিকের মধ্যে দেশপ্রেম, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্যবোধ সৃষ্টি করে।
- ৭. মৌলিক অধিকার ও কর্তব্যের উপলব্ধি: শিক্ষার মাধ্যমে নাগরিকরা রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করে। এর ফলে তারা নিজের অধিকার রক্ষা করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের কর্তব্য পালন করতে সক্ষম হয়।
- ৮. আইন ও শাসনব্যবস্থার প্রতি সচেতনতা: শিক্ষা নাগরিকদের দেশের আইন ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতন করে। তারা আইন মেনে চলা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার গুরুত্ব উপলব্ধি করে।
৩. রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও শিক্ষা Political Decision and Education
- ১. শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত: কোনো দেশের শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আদর্শ ও নীতির ভিত্তিতে শিক্ষার উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়। তাই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত শিক্ষাব্যবস্থার দিকনির্দেশ নির্ধারণে প্রভাবশালী।
- ২. শিক্ষার লক্ষ্য পরিবর্তনের সঙ্গে পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন: শিক্ষার লক্ষ্য পরিবর্তিত হলে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে পাঠ্যক্রমের গঠন, বিষয়বস্তুর নির্বাচন এবং পুনর্বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
- ৩. পাঠ্যক্রমের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষণ পদ্ধতির পরিবর্তন: শিক্ষার লক্ষ্য ও পাঠ্যক্রম পরিবর্তিত হলে শিক্ষণ পদ্ধতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন হয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাবে শিক্ষণ পদ্ধতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যকর কৌশল প্রয়োগ করা হতে পারে।
- ৪. রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব: রাষ্ট্রের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলে তার প্রভাব জাতীয় জীবনেও পড়ে। সেই পরিবর্তনের সূত্র ধরে শিক্ষাব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। ফলে শিক্ষা রাষ্ট্রের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
- ৫. রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন: রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পুনর্বিন্যাসও ঘটতে পারে। তখন আলোচনা, কর্মশালা, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, কৃত্তিমূলক সংগঠন এবং গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উপরও পড়ে।
- ৬. আধুনিক রাষ্ট্রে শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত: আধুনিক রাষ্ট্রে শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, জনসংখ্যা শিক্ষার প্রবর্তন, শারীরিক শিক্ষায় গুরুত্ব আরোপ, সার্বিক শিক্ষার প্রচলন এবং শিক্ষক শিক্ষণের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা।
Role of Education in challenging marginalization
প্রান্তিক গোষ্ঠী: সংজ্ঞা, শ্রেণিবিভাগ, বৈশিষ্ট্য ও শিক্ষাগত সমস্যা
১. প্রান্তিক গোষ্ঠীর ধারণা ও সংজ্ঞা
প্রান্তিক গোষ্ঠী বলতে সমাজের সেই ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে বোঝায় যারা সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার। তাদের সামাজিক মেলামেশা, সমান সুযোগ, অধিকার ও মর্যাদা সীমিত থাকে। ফলে তারা সমাজের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর তুলনায় পিছিয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের বিভিন্ন সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
- ১. Peter Leonard-এর মতে: প্রান্তিকতা বলতে উৎপাদনমূলক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূলস্রোতের বাইরে অবস্থান করাকে বোঝায়।
- ২. The Encyclopedia of Public Health-এর মতে: প্রান্তিকীকরণ হলো সমাজের কেন্দ্রস্থলে থাকা সুযোগ, ক্ষমতা ও সুবিধা থেকে কোনো গোষ্ঠীকে দূরে বা প্রান্তে অবস্থান করানো।
- ৩. Latin-এর মতে: প্রান্তিকতা অর্থনৈতিক কল্যাণ, মানবিক মর্যাদা ও শারীরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুতর বঞ্চনার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলি সাধারণত বৈষম্যের সম্মুখীন হয়।
- ৪. UNESCO Education for All Global Monitoring Report, 2010-এর মতে: শিক্ষায় প্রান্তিকতা হলো সামাজিক বৈষম্যের ভিত্তিতে সৃষ্ট তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা, যা একটি স্পষ্টভাবে দূর করা সম্ভব এমন সামাজিক অবিচারের উদাহরণ।
২. প্রান্তিক গোষ্ঠীর শ্রেণিবিভাগ
প্রান্তিক গোষ্ঠীকে বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।
- ১. লিঙ্গভিত্তিক প্রান্তিক গোষ্ঠী: মেয়েশিশু ও নারীরা বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষাগত বৈষম্যের কারণে এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
- ২. অবস্থান বা ভৌগোলিক ভিত্তিক প্রান্তিক গোষ্ঠী: সংঘাতপ্রবণ এলাকার শিশু, শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত শিশু এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী শিশুরা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
- ৩. বিশেষ গোষ্ঠীভিত্তিক প্রান্তিকতা: প্রতিবন্ধী শিশু, HIV/AIDS আক্রান্ত শিশু, অনাথ শিশু এবং বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন শিশুরা এই শ্রেণিতে পড়তে পারে।
- ৪. দারিদ্র্যভিত্তিক প্রান্তিকতা: কর্মরত শিশু, বয়সের তুলনায় শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা শিশু, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশু এবং একক মায়ের সন্তান এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
- ৫. সংস্কৃতিভিত্তিক প্রান্তিকতা: নির্দিষ্ট জাতি, উপজাতি, ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং নির্দিষ্ট ভাষাভাষী শিশুরা সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে প্রান্তিকতার শিকার হতে পারে।
৩. প্রান্তিক গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য
- ১. সামাজিক বৈষম্যের শিকার: প্রান্তিক গোষ্ঠীর সদস্যরা সামাজিক বৈষম্য, অত্যাচার, অবহেলা বা হীনমন্যতার শিকার হয়। তারা সমসুযোগ, সমঅধিকার, সমমর্যাদা ও স্বাধীনতা থেকে অনেক সময় বঞ্চিত থাকে।
- ২. স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য: এই গোষ্ঠীর সদস্যদের নিজস্ব ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনধারা থাকতে পারে। অনেক সময় সমাজের প্রভাবশালী গোষ্ঠী তাদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে যথাযথ সম্মান দেয় না।
- ৩. সমষ্টিগত পরিচয়: প্রান্তিক গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে সমষ্টিগত পরিচয় বা Collective Identity গড়ে ওঠে। একই ধরনের বঞ্চনা ও সমস্যার অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সংহতি সৃষ্টি করে।
- ৪. অন্তর্বিবাহের প্রবণতা: অনেক প্রান্তিক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যেই বিবাহ করার প্রবণতা দেখা যায়। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখার চেষ্টা করে।
- ৫. নিজস্ব সামাজিক নিয়ম: প্রান্তিক গোষ্ঠীর নিজস্ব সামাজিক নিয়ম ও রীতিনীতি থাকতে পারে। গোষ্ঠীর সদস্যদের জন্য এক ধরনের নিয়ম এবং গোষ্ঠীর বাইরের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্য ধরনের সামাজিক বিধি দেখা যেতে পারে।
- ৬. দারিদ্র্য: দারিদ্র্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। অনেক সদস্য চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে এবং মৌলিক জীবনযাপনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত থাকে।
৪. প্রান্তিক গোষ্ঠীর শিক্ষাগত সমস্যা
- ১. অর্থনৈতিক সমস্যা: দারিদ্র্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর শিক্ষার অন্যতম প্রধান বাধা। বেকারত্ব, ভূমিহীনতা, কর্মহীনতা ও প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে পরিবারের আয় কম থাকে। ফলে বই, পোশাক, যাতায়াত ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রী কেনার সামর্থ্য থাকে না।
- ২. পিতা-মাতার অশিক্ষা: প্রান্তিক গোষ্ঠীর অনেক পিতা-মাতা নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত। ফলে তাঁরা শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না এবং সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারেন না।
- ৩. সচেতনতার অভাব: শিক্ষা, সরকারি সুযোগসুবিধা, শিক্ষাবিষয়ক আইন ও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। ফলে প্রান্তিক পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী প্রাপ্য শিক্ষাগত সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়।
- ৪. শিশুশ্রম: দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশু অল্প বয়সেই কাজে যুক্ত হয়। পরিবারের আয়ে সাহায্য করার জন্য তারা বিদ্যালয়ে যাওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত হয়। ফলে তাদের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়।
- ৫. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: প্রান্তিক গোষ্ঠী অনেক সময় সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। বিদ্যালয় ও বৃহত্তর সমাজে সামাজিক মেলামেশার সুযোগ কম থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ ও সামাজিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
- ৬. দারিদ্র্যজনিত বঞ্চনা: দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বাসস্থান ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হয়। ফলে শিক্ষার প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
- ৭. লিঙ্গ বৈষম্য: মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য একটি বড় সমস্যা। অনেক পরিবারে ছেলে ও মেয়ের শিক্ষার সুযোগ সমানভাবে বিবেচনা করা হয় না। ফলে বিদ্যালয়, উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে।
- ৮. বিদ্যালয়ের বৈষম্যমূলক মনোভাব: কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক ও সহপাঠীদের আচরণে প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হয়। আলাদা করে বসানো, অবহেলা, অপমানজনক নামে ডাকা বা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া তাদের শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি করে।
- ৯. প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী: প্রান্তিক পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে। বাড়িতে পড়াশোনায় সহায়তা করার মতো কেউ না থাকায় তারা পড়াশোনায় অতিরিক্ত সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং অনেক সময় আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।
- ১০. ভাষা ও যোগাযোগের সমস্যা: বিদ্যালয়ের শিক্ষাদানের ভাষা অনেক সময় শিক্ষার্থীর প্রথম ভাষা নয়। ফলে বিষয়বস্তু বুঝতে অসুবিধা হয়, শ্রেণিকক্ষে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা কঠিন হয় এবং শিক্ষাগত ফলাফলও খারাপ হতে পারে।
- ১১. অস্বাস্থ্যকর বিদ্যালয় পরিবেশ: দূরবর্তী বা অনুন্নত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নিরাপদ পানীয় জল, শৌচাগার ও প্রয়োজনীয় আসবাবের অভাব থাকতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয় শারীরিকভাবে অনুপযোগীও হতে পারে।
- ১২. শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা: প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো, সহায়ক উপকরণ ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক না থাকলে তারা বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ে। পরিবার ও সমাজের অসচেতনতাও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়।
- ১৩. ভাষা ও সংস্কৃতিগত পার্থক্য: প্রান্তিক গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি বিদ্যালয়ের মূলধারার ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে আলাদা হতে পারে। এই পার্থক্যের কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের পরিবেশে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করতে পারে।
- ১৪. তথ্যের অভাব: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা, শিক্ষার অবস্থা, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও শিক্ষাগত সমস্যার পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে তাদের জন্য সঠিক শিক্ষানীতি ও কার্যকর কর্মসূচি তৈরি করা কঠিন হয়।
- ১৫. HIV ও AIDS-এর প্রভাব: HIV ও AIDS আক্রান্ত পরিবার ও শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যগত সমস্যার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যেরও শিকার হতে পারে। রোগ সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণে সহপাঠী ও সমাজের মানুষ তাদের থেকে দূরে থাকতে পারে। ফলে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও শিক্ষায় অংশগ্রহণ কমে যায়।
- ১৬. নিম্নমানের শিক্ষা: প্রান্তিক অঞ্চলের বিদ্যালয়ে কখনও প্রশিক্ষিত শিক্ষক, উপযুক্ত শিক্ষাসামগ্রী, কার্যকর পাঠক্রম, সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম ও উন্নত মূল্যায়ন ব্যবস্থার অভাব থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিম্নমানের শিক্ষা লাভ করে এবং মূলস্রোতের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে।
- ১৭. জাতি বা বর্ণব্যবস্থা: জাতি বা বর্ণভিত্তিক বৈষম্য শিক্ষায় প্রান্তিকীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তপশিলি জাতি ও অন্যান্য পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা সামাজিক অবহেলা, বৈষম্য এবং কম অংশগ্রহণের কারণে শিক্ষায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
- ১৮. ভৌগোলিক সমস্যা: দুর্গম গ্রাম, বস্তি, শরণার্থী শিবির, সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী শিশুরা বিদ্যালয় ও মৌলিক পরিষেবা থেকে দূরে থাকে। ফলে তারা শিক্ষার ন্যূনতম সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।
- ১৯. দূরত্ব: বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত দূরত্ব শিক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় বাধা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জন্য যাতায়াতের সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতা ও দীর্ঘ পথ বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। ফলে শিক্ষার সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হয়।
৫. প্রান্তিক গোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে শিক্ষার ভূমিকা [D.El.Ed 2020-22]
- ১. যোগ্য ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ: প্রান্তিক অঞ্চলের বিদ্যালয়ে যোগ্য ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা উন্নত ও কার্যকর শিক্ষার সুযোগ পাবে।
- ২. প্রান্তিক গোষ্ঠী থেকে শিক্ষক নিয়োগ: প্রান্তিক গোষ্ঠীর মধ্য থেকেই শিক্ষক ও শিক্ষিকা নিয়োগ করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমির সঙ্গে পরিচিত শিক্ষক পায়।
- ৩. দক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকাকে প্রস্তুত করা: প্রান্তিক অঞ্চলে কর্মরত দক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য প্রস্তুত করতে হবে।
- ৪. শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের সমস্যা, বৈষম্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও বিশেষ চাহিদা সম্পর্কে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
- ৫. International ও Bi-lingual Education: ভাষাগত বৈচিত্র্যের কথা বিবেচনা করে দ্বিভাষিক ও প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভাষাগত কারণে কোনো শিক্ষার্থী পিছিয়ে না পড়ে।
- ৬. প্রতিবন্ধীবান্ধব বিদ্যালয় তৈরি: বিদ্যালয় ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে শারীরিক ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন শিশুরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়।
- ৭. পিছিয়ে পড়া বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত সহায়তা: Disadvantaged School বা পিছিয়ে পড়া বিদ্যালয়গুলিকে অতিরিক্ত সম্পদ, শিক্ষাসামগ্রী ও Pedagogical Support প্রদান করতে হবে।
- ৮. প্রাসঙ্গিক পাঠক্রম তৈরি: প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জীবন, ভাষা, সংস্কৃতি ও বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাসঙ্গিক পাঠক্রম তৈরি করা দরকার।
- ৯. অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ: বিদ্যালয়ে এমন একটি Inclusive Setting বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বা শারীরিক পার্থক্যের কারণে কোনো শিক্ষার্থী নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করে।
Teacher and Society: A Critical Appraisal of Teachers’ Status
শিক্ষক ও সমাজ: শিক্ষকের মর্যাদার একটি সমালোচনামূলক পর্যালোচনা (Teacher and Society: A Critical Appraisal of Teachers’ Status)
শিক্ষক সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি শুধু বিদ্যালয়ে পাঠদান করেন না, বরং শিক্ষার্থীর জ্ঞান, চরিত্র, মূল্যবোধ, আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান অনেকাংশে শিক্ষকের দক্ষতা, সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত অবস্থানের উপর নির্ভরশীল। তাই শিক্ষক ও সমাজের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তবে বাস্তবে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা ও কাজের পরিবেশ সব ক্ষেত্রে সমান নয়। এই কারণে শিক্ষকের অবস্থানকে সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা
- ১. সমাজের পথপ্রদর্শক: শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঠিক জ্ঞান ও মূল্যবোধের পথে পরিচালিত করেন। তিনি ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরি করেন বলে সমাজে শিক্ষকের একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
- ২. চরিত্র গঠনে ভূমিকা: শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সততা, শৃঙ্খলা, সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা দেন। এর ফলে সমাজে সুস্থ ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে ওঠে।
- ৩. জাতি গঠনে ভূমিকা: একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকের উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। তাই শিক্ষককে জাতি গঠনের অন্যতম কারিগর বলা হয়।
- ৪. সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিনিধি: শিক্ষক সমাজে কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে পারেন। শিক্ষা ও যুক্তিবাদী চিন্তার মাধ্যমে তিনি সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখেন।
- ৫. শিক্ষার্থীর আদর্শ: শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শিক্ষকের আচরণ, কথা ও মূল্যবোধ অনুসরণ করে। তাই শিক্ষক তাদের কাছে একজন আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন।
শিক্ষকের মর্যাদার সমালোচনামূলক মূল্যায়ন
শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান সমাজে এই মর্যাদা নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে।
- ১. সামাজিক মর্যাদা ও বাস্তব অবস্থার পার্থক্য: সমাজে শিক্ষককে সম্মানজনক পেশার মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাস্তবে অনেক শিক্ষক কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ, প্রশাসনিক কাজ ও নানা সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হন। ফলে সামাজিক সম্মান সবসময় বাস্তব কর্মপরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।
- ২. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: শিক্ষকের মর্যাদার সঙ্গে তার উপযুক্ত বেতন ও আর্থিক নিরাপত্তা যুক্ত। পর্যাপ্ত বেতন, নিয়মিত পদোন্নতি, অবসরকালীন সুবিধা ও চাকরির নিরাপত্তা না থাকলে শিক্ষকের পেশাগত সন্তুষ্টি কমতে পারে।
- ৩. অতিরিক্ত কর্মভার: বর্তমানে শিক্ষকদের অনেক সময় পাঠদানের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ, তথ্য সংগ্রহ, নথিপত্র তৈরি, পরীক্ষা পরিচালনা ও অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতে হয়। অতিরিক্ত কর্মভার শিক্ষাদানের মূল উদ্দেশ্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
- ৪. পেশাগত স্বাধীনতা: একজন দক্ষ শিক্ষককে শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষণ পদ্ধতি নির্বাচন করার সুযোগ দেওয়া উচিত। অতিরিক্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা কঠোর নির্দেশনা শিক্ষকের সৃজনশীলতা ও পেশাগত স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।
- ৫. শিক্ষক-সমাজ সম্পর্ক: শিক্ষকের সঙ্গে অভিভাবক ও সমাজের সুসম্পর্ক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় শিক্ষার্থীর ফলাফল বা আচরণের জন্য শিক্ষককে একতরফাভাবে দায়ী করা হয়। এর ফলে শিক্ষক ও সমাজের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
- ৬. শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন: সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষণ পদ্ধতি ও প্রযুক্তির পরিবর্তন হচ্ছে। তাই শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ না থাকলে শিক্ষকের কার্যকারিতা কমতে পারে।
- ৭. শিক্ষকতার প্রতি সামাজিক প্রত্যাশা: সমাজ শিক্ষকের কাছে অত্যন্ত উচ্চমানের আচরণ ও ফলাফল প্রত্যাশা করে। এই প্রত্যাশা যুক্তিসঙ্গত হলেও শিক্ষকের সীমিত সম্পদ, সময় ও কর্মপরিবেশ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
- ৮. শিক্ষকের জবাবদিহিতা: শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদার পাশাপাশি জবাবদিহিতাও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষককে নিয়মিত, দায়িত্বশীল ও নৈতিকভাবে কাজ করতে হবে। তবে জবাবদিহিতা যেন অযথা চাপ বা অসম্মানের কারণ না হয়, সেদিকেও নজর রাখা দরকার।
- ৯. প্রযুক্তির প্রভাব: ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন ক্লাস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ শিক্ষকের ভূমিকার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। শিক্ষক এখন কেবল তথ্যের উৎস নন; বরং শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা ও শেখার সহায়ক।
- ১০. শিক্ষক মর্যাদা পুনর্গঠনের প্রয়োজন: শিক্ষকের মর্যাদা শুধু সামাজিক সম্মানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। উপযুক্ত বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণ, সামাজিক স্বীকৃতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগের মাধ্যমে শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়।
উপসংহার: শিক্ষক ও সমাজ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শিক্ষক যেমন সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, তেমনি সমাজও শিক্ষকের পেশাগত ও সামাজিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষকের মর্যাদা কেবল কথায় সম্মান প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। শিক্ষকের জন্য উপযুক্ত আর্থিক নিরাপত্তা, মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একজন সম্মানিত, দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের উন্নত শিক্ষা দিতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, সচেতন ও উন্নত সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন।