| (ক) কয়লা ও কয়লা শিল্পের ইতিহাস। (খ) কয়লার ব্যবহার ও বায়ুদূষণ। (গ) কয়লার উত্তোলন ও সমস্যা। (ঘ) প্রচলিত ও অপ্রচলিত শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা। | (1) তা সে যতই কালো হোক (2) কেমন করে হলো কালো (3) পুড়ে পুড়ে তাপ দিল, রইল পড়ে ছাই (4) কয়লার ধোঁয়া: দূষণ (5) ধস না নামে যেন (6) কম গরম আগুন বেশি গরম আগুন (7) নানাভাবে বিদ্যুৎ (8) জলের স্রোত, সূর্যের তাপ (9) প্রচলিত শক্তি, অপ্রচলিত শক্তি |
তা সে যতই কালো হোক
স্কুলের পাশে ইটভাটা তৈরির জন্য লরিভর্তি কয়লা আনা হয়। জানা যায় কয়লাগুলো রানিগঞ্জের কয়লাখনি থেকে এসেছে, যা বর্ধমানের পশ্চিমে অবস্থিত। কয়লা পশ্চিমবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ। ইট পোড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। তাই কয়লা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
কয়লাখনি দুই ধরনের হতে পারে: খোলামুখ খনি ও ভূগর্ভস্থ খনি। বড় খনিগুলো সাধারণত অনেক গভীর। কোথাও কোথাও পাঁচশো থেকে ছয়শো মিটার গভীর পর্যন্ত নামতে হয়। খনির ভিতরে সুড়ঙ্গ কেটে কাজ করতে হয়। ভিতরে বৈদ্যুতিক আলো থাকলেও চারদিকে কালো কয়লার স্তর ও ধুলো দেখা যায়। অনেক সময় জল জমে থাকে এবং পথ কাদা-কাদা হয়। কাজটি ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন।
কয়লার উপকারিতা যেমন আছে, তেমনি খনিশ্রমিকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কয়লা মূল্যবান সম্পদ হলেও তার উত্তোলন ও ব্যবহার সঠিক নিয়মে হওয়া উচিত, যাতে মানুষের জীবন ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
নিচের সারণিতে বিষয়গুলো আরও বিস্তারিতভাবে দেখানো হলো-
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| কয়লার উৎস | রানিগঞ্জ কয়লাখনি, বর্ধমানের পশ্চিমে |
| খনির ধরন | খোলামুখ খনি, ভূগর্ভস্থ খনি |
| খনির গভীরতা | প্রায় ৫০০–৬০০ মিটার পর্যন্ত |
| খনির পরিবেশ | অন্ধকার, কালো ধুলো, জল জমে থাকা, কাদা পথ |
| ব্যবহারের ক্ষেত্র | ইটভাটা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, লৌহ ও ইস্পাত শিল্প, রেলওয়ে |
| অর্থনৈতিক গুরুত্ব | পশ্চিমবঙ্গের প্রধান খনিজ সম্পদ, শিল্পোন্নয়নের ভিত্তি |
| ঝুঁকি | দুর্ঘটনা, ধস, গ্যাসের সমস্যা |
| করণীয় | নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ, শ্রমিক সুরক্ষা |
এই ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, কয়লা যতই কালো হোক, তার মূল্য ও প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা ছাড়া এর ব্যবহার বিপজ্জনক হতে পারে।
কেমন করে হলো কালো
এই অঞ্চলে বহু জায়গাজুড়ে কয়লাখনি রয়েছে। আসানসোল, রানিগঞ্জ, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার বিভিন্ন অংশে খনিগুলি ছড়িয়ে আছে। প্রায় দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে কয়লাক্ষেত্র বিস্তৃত। তবে সব জায়গায় সমান আকারে নয়। কোথাও বড়, কোথাও ছোট খনি দেখা যায়। কয়লা পশ্চিমবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর বড় ভূমিকা আছে।
মাটির নিচে এত কয়লা এল কীভাবে, তা বোঝাতে শিক্ষক কাঠকয়লার উদাহরণ দেন। কাঠ পুড়িয়ে কাঠকয়লা তৈরি করা যায়। যদি অনেক গাছ একসঙ্গে মাটির নিচে চাপা পড়ে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাপ ও চাপে থাকে, তবে তার ভেতরের কিছু অংশ পচে গেলেও কার্বনসমৃদ্ধ অংশ রয়ে যায়। হাজার হাজার বছর পরে সেই অংশ থেকেই কয়লা তৈরি হয়। অর্থাৎ প্রাচীন অরণ্যের গাছপালা ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়ে কয়লায় পরিণত হয়েছে।
নিচের সারণিতে বিষয়টি আরও বিশদভাবে দেখানো হলো
| বিষয় | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| কয়লার উৎপত্তি | বহু পুরোনো গাছপালা মাটির নিচে চাপা পড়ে দীর্ঘ সময়ে কয়লায় রূপান্তরিত হয়েছে |
| প্রয়োজনীয় শর্ত | তাপ, চাপ, অক্সিজেনের অভাব |
| সময়কাল | কয়েক হাজার থেকে লক্ষ বছর |
| গাছের নরম অংশ | পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায় |
| গাছের শক্ত অংশ | কার্বনে পরিণত হয়ে কয়লা হয় |
| উদাহরণ | কাঠ পুড়িয়ে কাঠকয়লা তৈরি হওয়া |
| খনির বিস্তার | আসানসোল, রানিগঞ্জসহ পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চল |
| অর্থনৈতিক গুরুত্ব | বিদ্যুৎ, ইটভাটা, শিল্পকারখানায় ব্যবহার |
এই আলোচনায় বোঝা যায়, কয়লা প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন বনভূমির অবশেষ। তাই এটি শুধু জ্বালানি নয়, প্রকৃতির দীর্ঘ ইতিহাসের ফল।
পুড়ে পুড়ে তাপ দিল, রইল পড়ে ছাই
অনেক হাজার বছর আগে বড় বড় গাছপালা মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। শুধু চাপ নয়, মাটির গভীরে প্রচণ্ড তাপও থাকে। চাপ ও তাপের প্রভাবে গাছের নরম অংশ পচে নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু কার্বনসমৃদ্ধ অংশ ধীরে ধীরে জমাট বাঁধে। সেই জমাট বাঁধা কার্বন থেকেই কয়লা তৈরি হয়। অর্থাৎ কয়লা মূলত প্রাচীন উদ্ভিদ ও প্রাণীর অবশেষ, যার প্রধান উপাদান কার্বন।
কাঠ পুড়লে যেমন কাঠকয়লা হয়, তেমনি দীর্ঘ সময় ধরে চাপা পড়ে থাকা গাছপালা থেকে প্রাকৃতিক কয়লা তৈরি হয়েছে। তবে এটি এক হাজার বছরে নয়, বহু হাজার বা লক্ষ বছরে হয়েছে। মাটির যত গভীরে যাওয়া যায়, তত বেশি চাপ ও তাপ পাওয়া যায়। আগ্নেয়গিরির উদাহরণ থেকেও বোঝা যায় যে পৃথিবীর ভেতরে প্রচণ্ড তাপ রয়েছে। এই তাপ ও চাপের যৌথ প্রভাবে কার্বনের পরিমাণ বেড়ে কয়লা তৈরি হয়েছে।
কয়লা পুড়লে ছাই কম হয়, কারণ এতে কার্বনের পরিমাণ বেশি থাকে। দীর্ঘদিন তাপ ও চাপে থাকার ফলে অন্যান্য উপাদান কমে গিয়ে কার্বন ঘনীভূত হয়েছে। তাই কয়লা শক্ত, কালো এবং জ্বালানিসমৃদ্ধ। নিচের সারণিতে বিষয়গুলো আরও বিস্তৃতভাবে দেখানো হলো
| বিষয় | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| উৎপত্তি | প্রাচীন গাছপালা ও জীবের অবশেষ |
| প্রধান উপাদান | কার্বন |
| প্রয়োজনীয় শর্ত | দীর্ঘকাল তাপ ও চাপ |
| অবস্থান | মাটির গভীরে |
| সময়কাল | হাজার থেকে লক্ষ বছর |
| নরম অংশের পরিণতি | পচে নষ্ট হয়ে যায় |
| শক্ত অংশের পরিণতি | কার্বনে পরিণত হয়ে কয়লা হয় |
| কয়লা পুড়লে ছাই কম হওয়ার কারণ | কার্বনের ভাগ বেশি |
| উদাহরণ | কাঠ পুড়িয়ে কাঠকয়লা হওয়া |
| ভূ-তাপের প্রমাণ | আগ্নেয়গিরির লাভা |
এভাবে বোঝা যায়, কয়লা প্রকৃতির দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তনের ফল এবং এটি পৃথিবীর ভেতরের তাপ ও চাপের কারণে সৃষ্টি হয়েছে।
কয়লার ধোঁয়া: দূষণ
কয়লা পোড়ালে যে ধোঁয়া বের হয় তা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই ধোঁয়ায় সালফারের অক্সাইড, নাইট্রোজেনের অক্সাইড, কার্বনের অক্সাইড এবং কার্বন মনোক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস থাকে। এগুলো বাতাসে মিশে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢোকে এবং চোখ, ফুসফুস, ত্বক ও অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি করে। ধোঁয়া বৃষ্টির জলে মিশে অ্যাসিড বৃষ্টি তৈরি করতে পারে, যা মাটি, গাছপালা ও স্থাপনার ক্ষতি করে।
ধোঁয়া সরাসরি চোখে লাগলে জ্বালা, পানি পড়া ও লালচে ভাব দেখা যায়। যাদের আগে থেকেই চোখের সমস্যা আছে তাদের ক্ষতি বেশি হয়। শ্বাসের সঙ্গে ধোঁয়া শরীরে ঢুকলে কাশি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি বৃদ্ধি, বুকে চাপ ও ফুসফুসের সংক্রমণ হতে পারে। দীর্ঘদিন এভাবে দূষিত বাতাসে থাকলে হৃদরোগ ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
ধোঁয়ার গ্যাসগুলো বাতাসে ভেসে গিয়ে মেঘে মিশে অ্যাসিড বৃষ্টি ঘটায়। এতে মাটির উর্বরতা কমে যায়, ফসলের ফলন হ্রাস পায় এবং জলাশয়ের পানিও দূষিত হয়। গাছের পাতায় ধোঁয়ার কণা জমে সূর্যালোক গ্রহণ কমায়, ফলে খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বাড়িঘরের দেওয়ালও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। নিচের সারণিতে ঘটনাভিত্তিক ক্ষতিগুলো বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো
| ঘটনা | কী ক্ষতি বা কীভাবে ক্ষতি হয় |
|---|---|
| চোখে ধোঁয়া লাগা | চোখ জ্বালা, পানি পড়া, লালচে ভাব, দৃষ্টি ঝাপসা |
| দীর্ঘ সময় ধোঁয়ার সংস্পর্শ | চোখের স্থায়ী ক্ষতি, অ্যালার্জি বৃদ্ধি |
| শ্বাসের সঙ্গে ধোঁয়া ঢোকা | কাশি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি বেড়ে যাওয়া |
| বিষাক্ত গ্যাস শরীরে প্রবেশ | ফুসফুসের ক্ষতি, রক্তে অক্সিজেন কমে যাওয়া |
| কার্বন মনোক্সাইডের প্রভাব | মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, গুরুতর হলে অজ্ঞান হওয়া |
| সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইড | অ্যাসিড বৃষ্টি সৃষ্টি |
| অ্যাসিড বৃষ্টি | মাটির উর্বরতা হ্রাস, ফসলের ক্ষতি |
| গাছের পাতায় কণা জমা | সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত |
| জলাশয়ে দূষণ | মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতি |
| স্থাপনার উপর প্রভাব | দেওয়াল, ধাতু ও পাথরের ক্ষয় |
এভাবে কয়লার ধোঁয়া শুধু মানুষের শরীর নয়, প্রকৃতি, কৃষি ও স্থাপনারও ব্যাপক ক্ষতি করে। তাই দূষণ কমানো ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
ধস না নামে যেন
নদীর পাড় ও কয়লাখনি অঞ্চলে ভেতর থেকে বালি বা কয়লা তোলার ফলে উপরিভাগের মাটি ফাঁপা হয়ে যায়। উপরের স্তরটি দেখতে শক্ত মনে হলেও নিচে ফাঁকা থাকায় হঠাৎ ধসে পড়ে। এভাবেই মানুষ, বাড়িঘর ও রাস্তার ক্ষতি হয়। নদীর ধারে বালি কাটলে পাড় ভেঙে যায়। একইভাবে খনিতে অতিরিক্ত কয়লা তুললে জমির উপরিভাগ বসে যায়, যাকে ধস নামা বলা হয়। এতে প্রাণহানি, সম্পত্তির ক্ষতি এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
সমস্যার কারণগুলো হলো
১. ভেতর থেকে অতিরিক্ত বালি বা কয়লা উত্তোলন
২. ফাঁকা জায়গা ভরাট না করা
৩. মাটির নিচে জল জমে স্তর দুর্বল হওয়া
৪. গাছপালা না থাকা, ফলে মাটির বাঁধন কমে যাওয়া
সমস্যা মোকাবিলার উপায়গুলো নিচের সারণিতে দেওয়া হলো
| সমস্যা মোকাবিলার উপায় | কীভাবে উপকার হবে |
|---|---|
| খনির ফাঁকা জায়গা বালি বা মাটি দিয়ে ভরাট করা | উপরিভাগ শক্ত থাকবে, ধসের আশঙ্কা কমবে |
| নিয়ম মেনে সীমিত পরিমাণ কয়লা ও বালি তোলা | ভেতরের ফাঁপা অংশ কম হবে |
| খনি এলাকায় বেশি করে গাছ লাগানো | গাছের শিকড় মাটি শক্ত করে ধরে রাখবে |
| মাটির নিচে জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা | ভেজা ও আলগা মাটি শক্ত থাকবে |
| বিপদসংকুল এলাকা চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা দেওয়া | মানুষ দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাবে |
| নিয়মিত পরিদর্শন ও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা | আগে থেকেই ঝুঁকি বোঝা যাবে |
| অবৈধ খনন বন্ধ করা | অতিরিক্ত ফাঁপা হওয়া রোধ হবে |
এইভাবে পরিকল্পিতভাবে খনি পরিচালনা, গাছ লাগানো এবং ফাঁকা স্থান ভরাট করলে ধসের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
কম গরম আগুন বেশি গরম আগুন
সব আগুন একরকম গরম নয়। আগুনের তাপ কম বা বেশি হতে পারে। কম গরম আগুনে রান্না করা যায়। যেমন কয়লার গুঁড়োর সঙ্গে মাটি মিশিয়ে গুল বানিয়ে ধীরে জ্বালালে রান্নার কাজ চলে। এতে কার্বনের পরিমাণ কম থাকলেও কাজ হয়। কিন্তু লোহা গলানো বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কাজে বেশি গরম আগুন দরকার। সেখানে বেশি কার্বনযুক্ত জ্বালানি লাগে।
কয়লা, পেট্রোলিয়াম, পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন এগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি। মাটির নিচে বহু বছর ধরে চাপ ও তাপে গাছপালা ও প্রাণীর অবশেষ থেকে এগুলো তৈরি হয়েছে। পেট্রোলিয়াম থেকে পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিন পাওয়া যায়। এগুলো একদিন ফুরিয়ে যাবে, কারণ এগুলো নতুন করে সহজে তৈরি হয় না। বিদ্যুৎও অনেক সময় এই জ্বালানি পুড়িয়ে তৈরি হয়, তবে জলবিদ্যুৎ বা সৌরশক্তির মতো অন্য উৎসও আছে। নিচের সারণিতে বিভিন্ন জ্বালানির ব্যবহার বেশি পয়েন্টে দেখানো হলো
| পেট্রোল ডিজেল কেরোসিন কী কী কাজে ব্যবহার হয় | বিদ্যুৎ কী কী কাজে ব্যবহার হয় |
|---|---|
| বাস, ট্রাক, গাড়ি চালাতে | বাড়ির আলো জ্বালাতে |
| মোটরসাইকেল, স্কুটার চালাতে | পাখা চালাতে |
| সেচের পাম্প চালাতে | টিভি, কম্পিউটার চালাতে |
| জেনারেটর চালাতে | ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন চালাতে |
| কেরোসিন স্টোভে রান্না করতে | মোবাইল চার্জ করতে |
| কারখানার যন্ত্র চালাতে | লিফট চালাতে |
| বিমান ও জাহাজ চালাতে | হাসপাতালের যন্ত্রপাতি চালাতে |
| নির্মাণকাজের মেশিন চালাতে | কারখানায় বিভিন্ন মেশিন চালাতে |
এইভাবে কম গরম ও বেশি গরম আগুনের প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন কাজে হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি সীমিত, তাই বিদ্যুৎ ও বিকল্প শক্তির সঠিক ব্যবহার জরুরি।
নানাভাবে বিদ্যুৎ
পেট্রোল, ডিজেল ও কয়লা একদিন ফুরিয়ে যেতে পারে, তাই বিদ্যুৎ শুধু কয়লা পুড়িয়ে তৈরি হয় না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের নানা উপায় আছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় টারবাইন ঘোরানো হয়। এই ঘূর্ণনের শক্তি থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। টারবাইন ঘোরাতে কখনও বাষ্প, কখনও জল, কখনও ডিজেল বা অন্য শক্তি ব্যবহার করা হয়।
ডায়নামো ঘোরালে ছোট করে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। যেমন সাইকেলে প্যাডেল করলে ডায়নামো ঘুরে বাতি জ্বলে। বড় আকারে একই নীতি ব্যবহার করে জেনারেটর চালানো হয়। লোডশেডিং হলে ডিজেল জেনারেটর চালিয়ে আলো জ্বালানো হয়।
জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে নদীর জলের স্রোত বা বাঁধের জল টারবাইন ঘোরায়। এতে কয়লা লাগে না। পাহাড়ি নদীর তীব্র স্রোত কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। জলের স্রোত সহজে ফুরিয়ে যায় না, তাই এটি তুলনামূলকভাবে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি। বিভিন্ন উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনামূলক সারণি নিচে দেওয়া হলো
| শক্তির উৎস | কীভাবে টারবাইন ঘোরে | বিশেষ বৈশিষ্ট্য | সীমাবদ্ধতা |
|---|---|---|---|
| কয়লা | কয়লা পুড়িয়ে বাষ্প তৈরি করে | দীর্ঘদিন ব্যবহৃত পদ্ধতি | দূষণ বেশি, জ্বালানি ফুরিয়ে যায় |
| ডিজেল | ডিজেল ইঞ্জিন জেনারেটর ঘোরায় | দ্রুত চালু করা যায় | জ্বালানি ব্যয়বহুল, দূষণ |
| জলবিদ্যুৎ | নদীর স্রোত বা বাঁধের জল | দূষণ কম, পুনর্নবীকরণযোগ্য | বড় বাঁধ নির্মাণ দরকার |
| ডায়নামো | হাত বা প্যাডেলে ঘোরানো | ছোট পরিসরে সহজ | শক্তি কম উৎপাদন |
| বাষ্প শক্তি | জল গরম করে বাষ্পের চাপ | বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত | জ্বালানির প্রয়োজন |
এইভাবে বিদ্যুৎ নানা উৎস থেকে তৈরি করা যায়। ভবিষ্যতে জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ রক্ষার জন্য জলবিদ্যুৎ ও অন্যান্য পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
জলের স্রোত, সূর্যের তাপ
সূর্যের তাপের কারণে জলচক্র চলে। সূর্যের তাপে সমুদ্র, নদী ও জলাশয়ের জল বাষ্প হয়ে আকাশে ওঠে। উপরে গিয়ে ঠান্ডা হয়ে মেঘ তৈরি করে। পাহাড়ে সেই জল বরফ হয়ে জমতে পারে। আবার তাপ বাড়লে বরফ গলে নদীর জল বাড়ে। বৃষ্টি হয়ে জল আবার নদী ও সমুদ্রে ফিরে আসে। এভাবেই জলের স্রোত ও প্রবাহ বজায় থাকে।
সূর্য না থাকলে জল বাষ্পীভবন হতো না, মেঘ তৈরি হতো না, বৃষ্টি হতো না। পাহাড়ের বরফ গলত না, নদীর জলও কমে যেত। তাই সূর্যের শক্তি পৃথিবীর জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সূর্যের শক্তি নানা কাজে ব্যবহার করা যায়। রোদে কাপড় শুকানো, ধান শুকানো, খাবার গরম করা ইত্যাদি সরাসরি কাজ। সূর্যের আলো সোলার প্যানেলে ফেললে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। সেই বিদ্যুৎ দিয়ে ক্যালকুলেটর, আলো, পাম্প, এমনকি বড় যন্ত্রও চালানো যায়।
নিচে বিষয়গুলো সারণিতে সাজানো হলো
| বিষয় | কীভাবে ঘটে বা ব্যবহার হয় |
|---|---|
| জল বাষ্পীভবন | সূর্যের তাপে জল বাষ্প হয়ে উপরে ওঠে |
| মেঘ তৈরি | বাষ্প ঠান্ডা হয়ে মেঘে পরিণত হয় |
| বৃষ্টি | মেঘ থেকে জলবিন্দু পড়ে বৃষ্টি হয় |
| বরফ গলা | সূর্যের তাপে পাহাড়ের বরফ গলে নদী সৃষ্টি হয় |
| নদীর স্রোত | বরফ গলা ও বৃষ্টির জলে নদীর প্রবাহ বজায় থাকে |
| রোদে শুকানো | কাপড়, শস্য ইত্যাদি শুকানো যায় |
| সোলার বিদ্যুৎ | সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন |
| দৈনন্দিন কাজ | আলো, ক্যালকুলেটর, ছোট যন্ত্র চালানো |
প্রচলিত শক্তি, অপ্রচলিত শক্তি
প্রচলিত শক্তি বলতে সেই সব শক্তিকে বোঝায় যেগুলো বহুদিন ধরে বেশি ব্যবহার হচ্ছে। যেমন কয়লা, পেট্রোলিয়াম, ডিজেল ইত্যাদি। এগুলো দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি, যানবাহন চালানো ও কারখানা চালানো হয়। জলবিদ্যুৎও বহু জায়গায় ব্যবহৃত হয়, তাই একে অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ধরা হয়।
অপ্রচলিত শক্তি হলো যেগুলো এখনও সব জায়গায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় না। যেমন সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাস, জোয়ারভাটা শক্তি ইত্যাদি। এগুলো প্রকৃতি থেকে সরাসরি পাওয়া যায় এবং সহজে ফুরিয়ে যায় না। তবে শুরুতে খরচ বেশি, যন্ত্রপাতি বসানো কঠিন এবং প্রযুক্তি সবার কাছে পৌঁছায়নি বলে এগুলো এখনও কম ব্যবহৃত।
সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে যে যন্ত্রগুলো চলে তার উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো
| যন্ত্রের নাম | কীভাবে চলে |
|---|---|
| সোলার লাইট | সোলার প্যানেলে চার্জ হয়ে রাতে জ্বলে |
| সোলার ক্যালকুলেটর | আলো পেলেই কাজ করে |
| সোলার ওয়াটার পাম্প | সূর্যের শক্তিতে জল তোলে |
| সোলার ফ্যান | প্যানেল থেকে বিদ্যুতে ঘোরে |
| সোলার চার্জার | মোবাইল চার্জ করে |
অপ্রচলিত শক্তির ধরন ও বৈশিষ্ট্য
| অপ্রচলিত শক্তির নাম | কেন অপ্রচলিত বলা হয় | কীভাবে প্রচলিত হতে পারে |
|---|---|---|
| সৌরশক্তি | সব জায়গায় প্যানেল বসানো হয়নি | খরচ কমলে ও সচেতনতা বাড়লে |
| বায়ুশক্তি | বড় টারবাইন বসাতে জায়গা লাগে | প্রযুক্তি সহজ হলে ও গ্রামে বসালে |
| বায়োগ্যাস | সবার বাড়িতে প্ল্যান্ট নেই | প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিলে |
| জোয়ারভাটা শক্তি | নির্দিষ্ট জায়গায় সম্ভব | উপকূলে প্রকল্প বাড়ালে |
| সৌর কুকার | রান্নায় সময় বেশি লাগে | উন্নত নকশা ও প্রচার করলে |
মানুষ ধীরে ধীরে পরিবেশবান্ধব শক্তির দিকে এগোচ্ছে। প্রযুক্তি সহজ ও সস্তা হলে অপ্রচলিত শক্তিও একসময় প্রচলিত হয়ে উঠবে।