| (ক) সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব। (খ) পরিবহন ব্যবস্থার ইতিহাস। (গ) আঞ্চলিক পরিবহন মাধ্যমের মানচিত্র নির্মাণ। (ঘ) দূষণ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন। | চলাফেরার সেকালে একাল নদীর উপর ভেসে চলা তোমার এলাকার যানবাহন পরিবেশ বান্ধব পরিবহন: সাইকেল পথের পাঁচালি: সাবধানে চালাও, জীবন বাঁচাও কু ঝিকঝিক |
চলাফেরার সেকালে একাল
আগেকার দিনে মানুষ দূরে যাতায়াত করত বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পরিবহনে। তখন বাস, ট্রেন বা গাড়ি সব জায়গায় ছিল না। মানুষ হেঁটে যেত, গরুর গাড়ি ব্যবহার করত, পালকি করে যেত, ঘোড়ার গাড়িতে চড়ত। কোথাও কোথাও হাতি বা উটের পিঠেও চড়ে যাতায়াত হতো। পরে রিকশা চালু হয়, প্রথমে মানুষ টানত, তারপর সাইকেল রিকশা প্রচলিত হয়। এসব যাত্রায় সময় বেশি লাগত এবং অনেক কষ্টও হতো, তবে সেগুলোই তখনকার প্রধান ভরসা ছিল। নিচের সারণিতে আগেকার পরিবহনের উদাহরণগুলো বেশি পয়েন্টসহ সাজানো হলো
| আগেকার পরিবহনের নাম | কোথায় চলত | কেমন লাগত | কতটা পথ যেতে সময় লাগত | খরচ কেমন ছিল | বিশেষ মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|---|
| পালকি | শহর ও গ্রাম | ভেতরে বসে আরাম, তবে দুলত | ধীরে যেত | ভাড়া বেশি | চারজন মানুষ বয়ে নিত |
| গরুর গাড়ি | গ্রামাঞ্চল | ধীরে, ঝাঁকুনি কম | অনেক সময় লাগত | কম খরচ | ধান ও মালপত্র বহনে ব্যবহৃত |
| ঘোড়ার গাড়ি | শহর | তুলনামূলক দ্রুত | মাঝারি সময় | মাঝারি খরচ | কলকাতায় প্রচলিত ছিল |
| হাতি | জঙ্গল ও রাজপথ | উঁচুতে বসা, ভয়ও লাগত | ধীর থেকে মাঝারি | খুব বেশি খরচ | রাজা ও জমিদার ব্যবহার করতেন |
| উট | মরুভূমি অঞ্চল | উঁচু ও দুলত | দীর্ঘ পথ পাড়ি দিত | মাঝারি | মাল বহনে উপযোগী |
| মানুষ টানা রিকশা | শহর | আরামদায়ক বসা | মাঝারি | ভাড়া নির্ভর | মানুষ টেনে নিয়ে যেত |
| সাইকেল রিকশা | শহর ও মফস্বল | কিছুটা ঝাঁকুনি | মাঝারি | তুলনামূলক কম | ১৯শ শতকের শেষভাগে প্রচলিত |
নদীর উপর ভেসে চলা
আগেকার দিনে নদীপথ ছিল যাতায়াতের অন্যতম ভরসা। চারদিকে বনজঙ্গল, কাঁচা রাস্তা ও বন্য প্রাণীর ভয় থাকায় মানুষ নদীর জলপথ বেছে নিত। তারা ভেলা, ডিঙি, পানসি, বড় নৌকা ব্যবহার করত। নৌকায় পাল থাকত, বাতাসে পাল ফুলে নৌকা এগোত। আবার দাড় টেনে মানুষ নিজে নৌকা চালাত। নৌকার দিক ঠিক রাখার জন্য হাল ব্যবহার করা হতো। হাল অনেকটা সাইকেলের হ্যান্ডেলের মতো কাজ করত।
পরে লঞ্চ ও ভুটভুটি চালু হয়। এগুলোতে ডিজেল ইঞ্জিন থাকে। ইঞ্জিনের শক্তিতে নৌকা দ্রুত চলে। পাল বা দাড়ের প্রয়োজন হয় না, তবে হাল থাকে দিক ঠিক করার জন্য। নদীপথে মানুষ ও মালপত্র বহন সহজ হতো, যদিও ঝড় বা ঢেউয়ের সময় সাবধানে চলতে হতো। নিচে বিষয়গুলো বেশি পয়েন্টসহ সারণিতে সাজানো হলো:
| কোথায় নৌকা চড়েছি | কী ধরনের নৌকা | কেন চড়েছি | নৌকায় কারা ছিলেন ও কী মালপত্র ছিল | দাড় ও হাল ছিল কিনা, কী কী ছিল |
|---|---|---|---|---|
| গ্রামে নদী পার হতে | ডিঙি নৌকা | বাজারে যেতে | মাঝি ও কয়েকজন যাত্রী, সবজি | দাড় ছিল, ছোট হাল ছিল |
| বড় নদীতে | পানসি নৌকা | মালপত্র আনতে | মাঝি ও শ্রমিক, ধান ও কাঠ | দাড় ও বড় হাল ছিল, পাল ছিল |
| শহরের ঘাটে | লঞ্চ | দূরে যেতে | চালক ও যাত্রী, ব্যাগপত্র | ইঞ্জিন ছিল, হাল ছিল, দাড় ছিল না |
| খালপথে | ভেলা | কাছাকাছি যাতায়াত | দুজন মানুষ, খড় বা কাঠ | দাড় ছিল, হাল ছিল না |
| নদীর ঘাটে | ভুটভুটি | দ্রুত যাতায়াত | চালক ও যাত্রী, ছোট মালপত্র | ডিজেল ইঞ্জিন ও হাল ছিল |
এইভাবে নদীর উপর ভেসে চলা পরিবহন একসময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখনও অনেক জায়গায় নৌকা, লঞ্চ ও ভুটভুটি মানুষের জীবনের অংশ।
তোমার এলাকার যানবাহন
আমাদের এলাকায় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলে। বড় পাকা রাস্তায় বাস, লরি ও ট্রাক চলাচল করে। ছোট রাস্তায় অটো, টোটো, মোটরসাইকেল ও সাইকেল বেশি দেখা যায়। গ্রাম্য কাঁচা পথে সাইকেল ও ভ্যানরিকশা সহজে চলতে পারে। কোথাও সরু সেতু বা ঘাট থাকলে বড় গাড়ি যেতে পারে না, সেখানে ছোট যানবাহন বা নৌকা ব্যবহৃত হয়।
মানচিত্র দেখে বোঝা যায় কোন রাস্তা চওড়া, কোনটি সরু, কোথায় খাল বা নদী আছে। চওড়া পাকা রাস্তায় ভারী যান চলে, সরু পথে হালকা যান চলে। সেতু শক্ত হলে বাস ও লরি যেতে পারে, নইলে শুধু সাইকেল বা মোটরসাইকেল যায়। এভাবে এলাকার পরিবহন ব্যবস্থা রাস্তার ধরন ও অবস্থার ওপর নির্ভর করে। নিচে বাড়ির কাছাকাছি চলাচল করা যানবাহনের একটি পর্যবেক্ষণ সারণি দেওয়া হলো:
| কবে দেখেছি | কখন দেখেছি | কোন দিক থেকে কোন দিকে গেছে | কী কী যান দেখেছি | সংখ্যা কত |
|---|---|---|---|---|
| ১০ জুন | সকাল ৮টা | উত্তর থেকে দক্ষিণ | বাস, সাইকেল | বাস ২টি, সাইকেল ৫টি |
| ১০ জুন | দুপুর ১টা | পূর্ব থেকে পশ্চিম | অটো, মোটরসাইকেল | অটো ৩টি, মোটরসাইকেল ৪টি |
| ১১ জুন | বিকেল ৫টা | দক্ষিণ থেকে উত্তর | লরি, টোটো | লরি ১টি, টোটো ৩টি |
| ১২ জুন | সকাল ৯টা | পশ্চিম থেকে পূর্ব | ভ্যানরিকশা, সাইকেল | ভ্যান ২টি, সাইকেল ৬টি |
এভাবে কয়েকদিন লক্ষ্য করলে বোঝা যায় কোন সময়ে কোন যান বেশি চলে এবং কোন রাস্তা দিয়ে কী ধরনের যান চলাচল উপযোগী।
পরিবেশ বান্ধব পরিবহন: সাইকেল
গাড়ি চললে ধুলো ও ধোঁয়া তৈরি হয়। ধোঁয়ায় কার্বন ডাইঅক্সাইডসহ নানা ক্ষতিকর গ্যাস থাকে। এগুলো বাতাস দূষিত করে, মানুষের শ্বাসকষ্ট বাড়ায় এবং চোখে জ্বালা করে। গাড়ির ধুলো গাছের পাতায় জমে পাতা ঠিকমতো খাদ্য তৈরি করতে পারে না। বৃষ্টির সময় রাস্তার তেল ও ময়লা ধুয়ে মাটি ও পুকুরে যায়, ফলে ফসল ও মাছের ক্ষতি হয়। তাই বেশি গাড়ি মানেই বেশি দূষণ।
সাইকেল চললে ধোঁয়া হয় না, জ্বালানি লাগে না এবং শব্দও কম হয়। এতে বাতাস পরিষ্কার থাকে, শরীরচর্চাও হয়। ভবিষ্যতে পেট্রোল ও ডিজেল কমে গেলে সাইকেলের গুরুত্ব আরও বাড়বে। তবে কিছু সমস্যা আছে, যেমন দুর্ঘটনার ভয়, সময় বেশি লাগা এবং বড় গাড়ির ধোঁয়া সাইকেল আরোহীর গায়ে লাগা। নিচে সমস্যাগুলি ও সমাধানগুলি সাজিয়ে দেওয়া হলো
| সমস্যা | কীভাবে কমানো যায় |
|---|---|
| অ্যাক্সিডেন্টের সমস্যা | আলাদা সাইকেল লেন তৈরি, হেলমেট ব্যবহার, ট্রাফিক নিয়ম মানা, রাস্তার পাশে স্পষ্ট চিহ্ন আঁকা |
| মানুষের কম সময়ের সমস্যা | ছোট দূরত্বে সাইকেল ব্যবহার, সাইকেল স্ট্যান্ড ও শেয়ারিং ব্যবস্থা বাড়ানো |
| অন্য গাড়ির ধোঁয়ার সমস্যা | দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোর করা, পুরোনো গাড়ি কমানো, বেশি গাছ লাগানো |
| আরাম ও কষ্টের সমস্যা | হালকা ও গিয়ারযুক্ত সাইকেল ব্যবহার, বিশ্রামস্থল তৈরি, সচেতনতা বৃদ্ধি |
এভাবে পরিকল্পনা করে চললে সাইকেল ব্যবহার বাড়বে, দূষণ কমবে এবং পরিবেশ আরও সুস্থ থাকবে।
পথের পাঁচালি: সাবধানে চালাও, জীবন বাঁচাও
কু ঝিকঝিক
ট্রেন একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা। এক একটি ট্রেনে অনেকগুলো বগি থাকে এবং প্রতিটি বগিতে বহু মানুষ বসতে পারে। মেল ট্রেনে আরও বেশি বগি ও শোওয়ার জায়গা থাকে। ট্রেন লোহার লাইনের উপর দিয়ে চলে। লাইনের ভেতরের দিকে চাকা বসানো থাকে, তাই সহজে লাইন থেকে সরে যায় না। ড্রাইভার সিগন্যাল দেখে, ঠিক সময়ে স্টার্ট দেয় এবং ব্রেক চাপিয়ে ট্রেন নিয়ন্ত্রণ করে।
আগে স্টিম ইঞ্জিনে কয়লা পুড়িয়ে জল ফুটিয়ে বাষ্প তৈরি করা হতো। সেই বাষ্পের চাপে পিস্টন নড়ত এবং চাকা ঘুরত। ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন চলে। ১৮৫৪ সালে হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হয়। ট্রেন চালু হওয়ায় যাতায়াত সহজ হয়েছে, কম সময়ে দূরে যাওয়া যায় এবং মালপত্র বহন করা সুবিধাজনক হয়েছে। কয়লা, লোহা, তেল, শস্য ইত্যাদি সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া যায়। এতে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও মেলামেশা বেড়েছে। নিচে বিষয়গুলি সারণি আকারে দেওয়া হলো
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ট্রেনের গঠন | বহু বগি থাকে, প্রতিটি বগিতে অনেক যাত্রী বসতে পারে |
| চলার পদ্ধতি | লোহার রেললাইনের উপর চাকা বসিয়ে চলে |
| নিরাপত্তা | চাকার খাঁজ থাকে, সিগন্যাল ও ব্রেক ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ |
| প্রাচীন ইঞ্জিন | স্টিম ইঞ্জিনে কয়লা পুড়িয়ে বাষ্পের চাপে চাকা ঘোরানো হতো |
| ভারতে সূচনা | ১৮৫৩ সালে প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন, ১৮৫৪ সালে হাওড়া-হুগলি রুট |
| সুবিধা | দ্রুত যাতায়াত, বেশি মানুষ ও মাল বহন, সময় ও খরচ সাশ্রয় |
| সামাজিক প্রভাব | বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ বৃদ্ধি |
আরও একটি সারণি
| প্রশ্ন | উত্তর |
|---|---|
| ট্রেনে মানুষ কী কী নিয়ে যায় | কাপড়চোপড়, খাবার, বই, দৈনন্দিন জিনিস, ব্যবসার মালপত্র |
| ট্রেনে কী কী মাল যায় | কয়লা, লোহা, তেল, শস্য, ফল, সবজি, যন্ত্রাংশ |
| কেন ট্রেন গুরুত্বপূর্ণ | একসঙ্গে অনেক মানুষ ও ভারী মাল দূরে পৌঁছে দিতে পারে |
এভাবে ট্রেন আমাদের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ ও উন্নত করেছে।