মৃত্তিকা (Soil) :
- মৃত্তিকা বা Soil শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ‘Solum’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ভূমিতল বা মেঝে (Floor)।
- ভূপৃষ্ঠের সমতলে বিভিন্ন খনিজ ও জৈব পদার্থসমূহ যে শিথিল, নিকষ, ভঙ্গুর আবরণী স্তর উদ্ভিদের ধারণ ও বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, তাকে মৃত্তিকা বলে।
- রুশ বিজ্ঞানী ভি ভি ডকুচেভ (V V Dokuchaev)-কে মৃত্তিকা বিজ্ঞানের জনক বলা হয়।
- মৃত্তিকা বিজ্ঞানের যে শাখায় মাটির প্রাকৃতিক উপাদান, ক্ষয় সংরক্ষণ, গঠন, শ্রেণীবিভাগ, স্তরায়ন প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে পেডোলজি (Pedology) বলে।
- মৃত্তিকা বিজ্ঞানের যে শাখায় মৃত্তিকার গুণাবলির ভিত্তিতে মাটির উর্বরতা, উদ্ভিদের জন্ম ও বৃদ্ধি, মাটির পরিবর্তনে উদ্ভিদের বৃদ্ধন নিয়ে আলোচনা হয়, তাকে এডাফোলজি (Edaphology) বলে।
মৃত্তিকার উপাদান (Components of Soil)
- কঠিন (Solid) — 50%
- → খনিজ পদার্থ — 45%
- → জৈব পদার্থ — 5%
- তরল (Liquid) — 25%
- গ্যাসীয় (Aerial) — 25%
মৃত্তিকা সৃষ্টির নিয়ামক (Controlling Factors of Soil Formation):
রুশ বিজ্ঞানী ডকুচেভ 1954 সালে মৃত্তিকা সৃষ্টির চারটি নিয়ামককে একটি সমীকরণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। সেটি হল:
S = f (cl, o, p, t)
[যেখানে, S = Soil বা মৃত্তিকা, f = Function বা কার্যকারিতা,
cl = Climate বা জলবায়ু, p = Parent Materials বা আদি শিলা,
o = Organism বা জীবজগৎ, t = Time বা সময়, r = Relief বা ভূপ্রকৃতি]
মার্কিন বিজ্ঞানী এইচ জেনি (H Jenny) ডকুচেভের চারটি উপাদানের সঙ্গে আরও একটি উপাদান যুক্ত করে একটি সমীকরণ দেন। সেটি হল:
S = f (cl, o, p, r, t)
রুশ বিজ্ঞানী জে এস জফে (J S Joffe) মৃত্তিকা সৃষ্টির নিয়ামকগুলিকে সক্রিয়তার ভিত্তিতে দুটি ভাগ করেন:
মৃত্তিকা সৃষ্টির নিয়ামকসমূহ (Controlling Factors of Soil Formation)
| প্রধান ভাগ | নিয়ামক | উপাদান / উদাহরণ |
|---|---|---|
| সক্রিয় নিয়ামক (Active Factors) | জলবায়ু | বৃষ্টিপাত |
| তাপমাত্রা | ||
| জীবজগৎ | উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব (ইঙ্গিতভাবে) | |
| নিষ্ক্রিয় নিয়ামক (Passive Factors) | আদি শিলা (Parent Material) | |
| ভূপ্রকৃতি (Relief / Topography) | ||
| সময় (Time) |
মৃত্তিকার ধর্ম (Properties of Soil)
| প্রধান ভাগ | উপধর্ম / বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| ভৌত ধর্ম (Physical Properties) | গঠন |
| গঠন (Structure) | |
| বর্ণ (Color) | |
| সেঁধ্রতা | |
| আর্দ্রতা | |
| নমনীয়তা | |
| ঘনত্ব | |
| জলধারণ ক্ষমতা | |
| সংযোজন ও প্রসারণ ক্ষমতা | |
| রাসায়নিক ধর্ম (Chemical Properties) | pH |
| আয়ন বিনিময় ক্ষমতা | |
| জৈব পদার্থ | |
| পুষ্টিমৌল |
মৃত্তিকা ক্ষয় (Soil Erosion):
বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে মাটির উপরের স্তর ও উর্বর অংশের ক্ষয়কে মৃত্তিকা ক্ষয় বলে। মৃত্তিকা ক্ষয়ের কারণগুলি হল—
মৃত্তিকা ক্ষয়
প্রাকৃতিক কারণ
- জলধারা
- চাদর ক্ষয় (Sheet Erosion)
- নালি ক্ষয় (Rill Erosion)
- খাত ক্ষয় (Gully Erosion)
- বায়ুধারা
- বৃষ্টিপাত
- ভূমিধস
- হিমবাহ ও সমুদ্রের ঢেউ
মনুষ্যসৃষ্ট কারণ
- অনিয়ন্ত্রিত বৃক্ষছেদন
- অযৌক্তিক কৃষিপদ্ধতি
- অনিয়ন্ত্রিত পশুচারণ
- নির্মাণ ও খননকাজ
মৃত্তিকা সংরক্ষণ (Soil Conservation)
যে পদ্ধতিতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মৃত্তিকাকে ক্ষয় ও অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে মানুষের কল্যাণে সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাকে মৃত্তিকা সংরক্ষণ বলে।
মৃত্তিকা সংরক্ষণ পদ্ধতি (Soil Conservation Methods)
| ক্রম | পদ্ধতি (বাংলা) |
|---|---|
| ১ | বনায়ন (Afforestation) |
| ২ | ফসল পর্যায়ক্রম (Crop Rotation) |
| ৩ | সমোন্নতিরেখা বরাবর চাষ (Contour Farming) |
| ৪ | স্থানান্তর কৃষিরোধ (Prevention of Shifting Cultivation) |
| ৫ | শেল্টার বেল্ট / বায়ুরোধক বৃক্ষসারি (Shelter Belt) |
| ৬ | নিয়ন্ত্রিত পশুচারণ (Restrained Grazing) |
| ৭ | ধাপ চাষ (Step Farming) |
| ৮ | ফালি চাষ (Strip Farming) |
| ৯ | জৈব সারের ব্যবহার (Use of Organic Fertilizer) |
| ১০ | মালচিং (Mulching) |
পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকা (Soil of West Bengal)
- পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে শিলা প্রকৃতি ও জলবায়ু ভিন্ন হওয়ায় এখানে বিভিন্ন প্রকার মৃত্তিকা দেখা যায়।
- প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য, উৎপাদন ও উৎপত্তির পার্থক্যের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকাকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়।
পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকার শ্রেণীবিভাগ (Classification of Soil of West Bengal)
- পলি মৃত্তিকা (Alluvial Soil)
- নবীন (New)
- প্রাচীন (Old)
- ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা (Laterite Soil)
- পর্বত মৃত্তিকা (Podzol Soil)
- ধূসর বাদামি বর্ণের মৃত্তিকা (Greyish Brown Soil)
পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকার সংক্ষিপ্ত বিবরণ (Brief Description of Soil of West Bengal)
| মৃত্তিকার নাম | আঞ্চলিক বিস্তৃতি | বৈশিষ্ট্য | উৎপাদিত শস্য |
|---|---|---|---|
| 1a) পলি মৃত্তিকা (প্রাচীন) | উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা (বরেন্দ্রভূমি), বীরভূমের পূর্বাংশ | (i) উত্তর সমভূমির প্রাচীন মাটির রং হালকা লাল। (ii) বয়সে প্রাচীন ও মাঝারি উর্বর প্রকৃতির। | ধান, গম, আখ |
| 1b) পলি মৃত্তিকা (নবীন) | হাওড়া, হুগলি, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর (গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ) | (i) দক্ষিণের সমভূমির নবীন মাটির রং কালচে বাদামি। (ii) বয়সে নবীন ও উর্বর প্রকৃতির। | ধান, পাট, গম |
| 2) ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা | পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান, ঝাড়গ্রাম (মালভূমি অঞ্চল) | (i) লাল বর্ণের অনুর্বর মাটি। (ii) কংকরপূর্ণ, শক্তত্ব বেশি। | সেচে: মাকাই, ডাল, আখ, চা, চিনাবাদাম, কমলালেবু |
| 3) পডজল / পর্বত মৃত্তিকা | দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি পার্বত্য অঞ্চল | (i) হলদে, বাদামি বা ধূসর বর্ণের। (ii) বালুকাময়, পাথরযুক্ত ও অম্লীয় প্রকৃতি। (iii) জৈব পদার্থে সমৃদ্ধ। | চা, সিনকোনা, komla |
| 4) ধূসর বাদামি বর্ণের মৃত্তিকা | হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের পাদদেশীয় দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি তরাই অঞ্চল | (i) সচ্ছিদ্র, অম্লীয় এবং আর্দ্র প্রকৃতির (ii) গাছ সহজে জন্মে (iii) এই মৃত্তিকার স্তর দেখা যায় (iv) ফলের বাগান ও বৃষ্টিপাত বেশি (v) নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ | ধান, চা, গম, বার্লি, কমলালেবু |
| 5) উপকূলের লবণাক্ত মৃত্তিকা | পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাংশে সুন্দরবন ও কাঁথি উপকূল অঞ্চল | (i) লবণাক্ত ও কাঁদাযুক্ত কালো বর্ণের (ii) জোয়ার-ভাটার প্রভাবে মাটির লবণাক্ততা বেশি | লঙ্কা, নারকেল |

