ফোটোসিন্থেসিস শব্দের অর্থ: গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে: Photos = আলো, Synthesis = সংশ্লেষ/তৈরি করা অর্থাৎ আলো ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি।
সালোকসংশ্লেষের সংজ্ঞা
যে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় ক্লোরোফিলযুক্ত উদ্ভিদ সূর্যালোকের উপস্থিতিতে পরিবেশ থেকে গৃহীত জল (H₂O) ও কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) এর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় খাদ্য হিসেবে গ্লুকোজ উৎপন্ন করে, যা পরে শ্বেতসাররূপে সঞ্চিত থাকে, এবং একই সাথে অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়; তাকে সালোকসংশ্লেষ বলে। এটি উদ্ভিদের খাদ্য উৎপাদনের প্রধান প্রক্রিয়া এবং পৃথিবীর জীবজগতের শক্তির উৎস।
রাসায়নিক সমীকরণ

সালোকসংশ্লেষের বৈশিষ্ট্য
- ৬ অণু CO₂ গ্রহণ ও ৬ অণু O₂ নির্গমন ঘটে।
- উৎপন্ন গ্লুকোজ অজৈব পদার্থ থেকে জৈব পদার্থ তৈরি করে — তাই এটি উপচয় (Anabolic) প্রক্রিয়া।
- কার্বন ডাইঅক্সাইডের কার্বন জৈব যৌগে রূপান্তরিত হয় — একে কার্বন আত্মীকরণ বলা হয়।
- জল জারিত হয় এবং CO₂ বিজারিত হয় — তাই এটি জারণ-বিজারণ বিক্রিয়া।
- নির্গত অক্সিজেনের উৎস জল।
- এই প্রক্রিয়া ছাড়া খাদ্য শৃঙ্খল চলতে পারে না।
- পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের ভারসাম্য রক্ষা করে।
সালোকসংশ্লেষ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার
| বিজ্ঞানীর নাম | আবিষ্কার |
|---|---|
| চার্লস বার্নেস | ‘ফোটোসিন্থেসিস’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন এবং প্রক্রিয়াটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত করেন। |
| জোসেফ প্রিস্টলে | উদ্ভিদ বায়ু বিশুদ্ধ করতে পারে এবং O₂ গ্যাস উৎপন্ন করে, এটি প্রমাণ করেন। |
| ইঞ্জেনহাউজ | দেখান যে আলো থাকলে সবুজ অংশেই O₂ উৎপন্ন হয় এবং CO₂ শোষিত হয়। |
| স্যাকস | প্রথম অন্ধকার বিক্রিয়া (Dark reaction) পর্যবেক্ষণ করেন এবং শ্বেতসার উৎপাদন দেখান। |
| রবার্ট হিল | হিল বিক্রিয়া আবিষ্কার করেন, যা প্রমাণ করে আলো বিক্রিয়ায় জল ভাঙে। |
| রুবেন ও ক্যামেন | প্রমাণ করেন নির্গত অক্সিজেনের উৎস CO₂ নয়, বরং জল। |
| বেনসন ও কেলভিন | কেলভিন চক্র আবিষ্কার করেন এবং প্রথম স্থায়ী যৌগ PGA চিহ্নিত করেন। |
| হ্যাচ ও স্ল্যাক | C₄ পথ আবিষ্কার করেন যা উচ্চ তাপমাত্রায় কার্যকর। |
| হিল ও বেন্ডাল | Z-scheme ব্যাখ্যা করেন, যা আলোক বিক্রিয়ার ইলেকট্রন প্রবাহ বোঝায়। |
- সালোকসংশ্লেষের স্থান: পাতার মেসোফিল কলা
- অঙ্গাণু: ক্লোরোপ্লাস্ট
- সালোকসংশ্লেষণীয় একক: কোয়ান্টোসোমা
- সালোকসংশ্লেষে ব্যবহৃত রঞ্জক
- প্রধান রঞ্জক: ক্লোরোফিল a, ক্লোরোফিল b
- সহায়ক রঞ্জক
- ১. ক্যারোটিনয়েড (এটি দুই প্রকার)
- ক্যারোটিন (কমলা)
- জ্যান্থোফিল (হলুদ)
- ২. ফাইকোবিলিন (এটি দুই প্রকার)
- ফাইকোএরিথ্রিন (লাল)
- ফাইকোসায়ানিন (নীল)
- ১. ক্যারোটিনয়েড (এটি দুই প্রকার)
রঞ্জকতন্ত্র (Pigment System)
ক্লোরোপ্লাস্টের থাইলাকয়েড পর্দায় উপস্থিত ক্লোরোফিল, ক্যারোটিনয়েড, প্রোটিন প্রভৃতি মিলিত হয়ে যে জটিল গঠন তৈরি করে তাকে রঞ্জকতন্ত্র বলে। (দুই রঞ্জকতন্ত্র)
রঞ্জকতন্ত্র I বা PSI (700 nm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে)
রঞ্জকতন্ত্র II বা PSII (680 nm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে)
শক্তির রূপান্তর: আলোকশক্তি → রাসায়নিক শক্তি
সালোকসংশ্লেষের নিয়ন্ত্রক বাহ্যিক শর্তসমূহ
1. প্রয়োজনীয় তরঙ্গদৈর্ঘ্য: ৩৯০ nm থেকে ৭৬০ nm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোতে সালোকসংশ্লেষের হার সর্বাধিক হয় (এটিকে সালোকসংশ্লেষের কার্য বর্ণালি বলে)

- Red drop: ৬৮০ nm এর বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো এককভাবে প্রয়োগ করলে সালোকসংশ্লেষের হার হঠাৎ কমে যায়
2. সালোকসংশ্লেষের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা: ২৫°C থেকে ৩৭°C
ইলেকট্রন পরিবহনকারী আয়ন: সালোকসংশ্লেষে ইলেকট্রন পরিবহনে সাহায্য করে
সালোকসংশ্লেষ সক্ষম প্রোটিস্ট: Euglena sp., Chrysamoeba sp.
সালোকসংশ্লেষকারী ব্যাকটেরিয়া: Rhodospirillum sp., Rhodopseudomonas sp.
সালোকসংশ্লেষকারী মূল: অর্কিড, গুলঞ্চ
সালোকসংশ্লেষে অসমর্থ উদ্ভিদ: স্বর্ণলতা (Cuscuta sp.), ইন্ডিয়ান পাইপ (Monotropa sp.)
ক্ষয়পুরণ বিন্দু (Compensation point): দিনের বেলা যে আলোক তীব্রতায় সালোকসংশ্লেষ ও শ্বসনের হার সমান হয় তাকে ক্ষয়পুরণ বিন্দু বলে
সালোকসংশ্লেষে ব্যবহৃত প্রধান উপাদান
| উপাদান | উৎস | ভূমিকা |
|---|---|---|
| জল (H₂O) | মাটির কোষীয় জল, জলীয় বাষ্প | অক্সিজেনের উৎস, ইলেকট্রন দান, গ্লুকোজ উৎপাদনে সাহায্য |
| কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) | বায়ু, জলে দ্রবীভূত কার্বনেট | গ্লুকোজের কার্বন উৎস |
| ক্লোরোফিল | সবুজ কোষের ক্লোরোপ্লাস্ট | সূর্যালোক শোষণ, শক্তি রূপান্তর |
| সূর্যালোক | সূর্য | ক্লোরোফিল সক্রিয়করণ, ATP উৎপাদন |