Biodiversity and Conservation

Rate this post

জীববৈচিত্র্যের সংজ্ঞা (Biodiversity)

জীববৈচিত্র্য বলতে পৃথিবীতে বিদ্যমান সকল প্রকার জীবের বৈচিত্র্যকে বোঝায়, যার মধ্যে উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব এবং তাদের জিনগত পার্থক্য ও বাস্তুতান্ত্রিক সম্পর্ক অন্তর্ভুক্ত। জীববৈচিত্র্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের স্থায়িত্ব এবং মানবজীবনের অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জিনগত বৈচিত্র্য (Genetic Diversity)

একই প্রজাতির জীবের মধ্যে জিনগত পার্থক্যকে জিনগত বৈচিত্র্য বলা হয়। এটি অভিযোজন ক্ষমতা বাড়ায় এবং রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

  • প্রজাতিগত বৈচিত্র্য (Species Diversity): কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির জীবের সংখ্যা ও বৈচিত্র্যকে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বলা হয়। এটি বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।
  • বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য (Ecological Diversity): বিভিন্ন প্রকার বাস্তুতন্ত্র যেমন বন, ঘাসভূমি, জলাভূমি ও মরুভূমির বৈচিত্র্যকে বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য বলা হয়।

পৃথিবীতে ও ভারতে মোট প্রজাতির সংখ্যা

বিজ্ঞানীদের অনুমান অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন (৮৭ লক্ষ) প্রজাতির জীব রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র প্রায় ১.৮ মিলিয়ন প্রজাতি এখনো পর্যন্ত সনাক্ত ও নামকরণ করা হয়েছে। এই প্রজাতিগুলোর মধ্যে উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব, ছত্রাক এবং অন্যান্য জীব অন্তর্ভুক্ত। ভারত বিশ্বের অন্যতম জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ দেশ এবং পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের মাত্র ২.৪% এলাকা জুড়ে অবস্থান করলেও প্রায় ৮% বিশ্ব জীববৈচিত্র্য ভারতে পাওয়া যায়। ভারতে আনুমানিক ১,০০,০০০-এর বেশি প্রাণী প্রজাতি এবং ৪৫,০০০-এর বেশি উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে। ভারতকে একটি মেগা-বায়োডাইভার্স দেশ বলা হয় এবং এখানে চারটি জীববৈচিত্র্য হটস্পট রয়েছে: হিমালয়, পশ্চিমঘাট, ইন্দো-বর্মা ও সুন্দরবন অঞ্চল।

জীববৈচিত্র্যের ধরণ (Patterns of Biodiversity)

জীববৈচিত্র্য সাধারণত অক্ষাংশ, উচ্চতা, জলবায়ু ও বাস্তুতন্ত্রের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।

অক্ষাংশীয় ধারা (Latitudinal Gradients)

অক্ষাংশীয় ধারা অনুযায়ী বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য সর্বাধিক এবং মেরু অঞ্চলের দিকে যেতে যেতে তা কমে যায়। এর প্রধান কারণ হলো বিষুবীয় অঞ্চলে সারা বছর উষ্ণ তাপমাত্রা, পর্যাপ্ত সূর্যালোক ও বেশি বৃষ্টিপাত। এই পরিবেশ উদ্ভিদ ও প্রাণীর দ্রুত বৃদ্ধি ও বিবর্তনের জন্য অনুকূল। ভারত বিষুবরেখার কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় এখানে জীববৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন ও জলাভূমিতে প্রজাতির সংখ্যা বেশি পাওয়া যায়।

প্রজাতি–ক্ষেত্র সম্পর্ক (Species–Area Relationship)

প্রজাতি–ক্ষেত্র সম্পর্ক অনুযায়ী কোনো অঞ্চলের আয়তন যত বড় হয়, সেখানে প্রজাতির সংখ্যাও তত বেশি হয়। ছোট এলাকায় সীমিত সম্পদের কারণে কম প্রজাতি টিকে থাকতে পারে। বড় বনাঞ্চল বা সংরক্ষিত এলাকা বেশি জীববৈচিত্র্য ধারণ করতে সক্ষম। ভারতের বড় জাতীয় উদ্যান ও অভয়ারণ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রজাতির দেখা মেলে। এই সম্পর্ক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পরিকল্পনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাস্তুতন্ত্রে প্রজাতিগত বৈচিত্র্যের গুরুত্ব

প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন প্রজাতি খাদ্যশৃঙ্খলে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করে, ফলে শক্তির সঠিক প্রবাহ নিশ্চিত হয়। কোনো একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে অন্য প্রজাতি তার ভূমিকা পালন করে বাস্তুতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে পারে। উচ্চ প্রজাতিগত বৈচিত্র্য পরিবেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অধিক সহনশীল করে তোলে। কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও পরাগবাহী পোকামাকড় উৎপাদন বাড়ায়। ভারতে বন ও জলাভূমিতে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

জীববৈচিত্র্য হ্রাস (Loss of Biodiversity)

জীববৈচিত্র্য হ্রাস বলতে উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য ক্রমশ কমে যাওয়াকে বোঝায়। আধুনিক উন্নয়ন, বন উজাড়, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বহু প্রজাতি আজ বিপন্ন। ভারতে বনভূমি কমে যাওয়া, নদী দূষণ এবং নগরায়নের কারণে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য হ্রাসের ফলে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়, খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং মানবজীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে। অনেক মূল্যবান ঔষধি উদ্ভিদ ও প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

জীববৈচিত্র্য হ্রাসের কারণ

জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান কারণ হলো বন ধ্বংস, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, বহিরাগত প্রজাতির আগমন এবং মানবসৃষ্ট কার্যকলাপ।

  • (i) আবাসস্থল ধ্বংস ও খণ্ডীকরণ: বন উজাড়, রাস্তা ও শিল্প স্থাপনের ফলে প্রাণীদের আবাসস্থল নষ্ট হয়। বড় বনভূমি ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হলে প্রজাতির টিকে থাকা কঠিন হয়।
  • (ii) অতিরিক্ত শোষণ: অতিরিক্ত শিকার, মাছ ধরা ও উদ্ভিদ সংগ্রহের ফলে অনেক প্রজাতির সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে।
  • (iii) বহিরাগত প্রজাতির আগমন: বহিরাগত প্রজাতি স্থানীয় প্রজাতির খাদ্য ও আবাস দখল করে নেয়, ফলে দেশীয় প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
  • (iv) সহ-বিলুপ্তি (Co-extinction): একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে তার ওপর নির্ভরশীল অন্য প্রজাতিও বিলুপ্ত হয়ে যায়, একে সহ-বিলুপ্তি বলা হয়।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বলতে উদ্ভিদ, প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা ও টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করাকে বোঝায়।

কেন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ জরুরি?

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে জরুরি। এটি মানবস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জীববৈচিত্র্য রক্ষা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

কীভাবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা যায়?

সংরক্ষিত এলাকা গঠন, বনায়ন, আইন প্রয়োগ, পরিবেশ শিক্ষা, টেকসই কৃষি ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা যায়। ভারত সরকার বিভিন্ন জাতীয় উদ্যান ও অভয়ারণ্য স্থাপন করেছে।

  • ইন-সিটু সংরক্ষণ (In situ Conservation): প্রাকৃতিক আবাসস্থলে জীবকে সংরক্ষণ করাকে ইন-সিটু সংরক্ষণ বলা হয়। জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল এর উদাহরণ।
  • এক্স-সিটু সংরক্ষণ (Ex situ Conservation): প্রাকৃতিক আবাসের বাইরে জীব সংরক্ষণ করাকে এক্স-সিটু সংরক্ষণ বলা হয়। চিড়িয়াখানা, উদ্ভিদ উদ্যান ও জিন ব্যাংক এর উদাহরণ।

রামসার সাইট (Ramsar Sites)

রামসার সাইটের সংজ্ঞা (Definition of Ramsar Sites): রামসার সাইট হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি, যা জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে Ramsar Convention অনুযায়ী তালিকাভুক্ত করা হয়। ১৯৭১ সালে ইরানের রামসার শহরে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এসব জলাভূমি পাখি, মাছ, উদ্ভিদ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়।

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ভারতে মোট ৯৮টি রামসার সাইট রয়েছে, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বাধিক। সাম্প্রতিক সংযোজনের ফলে এসব জলাভূমির মোট আয়তন ১৩.৬ লক্ষ হেক্টরেরও বেশিRamsar Convention–এর অধীনে ১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক গুরুত্বের ভিত্তিতে এই জলাভূমিগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রামসার সাইটগুলোর মূল লক্ষ্য হলো জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাস রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বাস্তুতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

  • ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী গত বিশ্বব্যাপী ২,৫০০টিরও বেশি রামসার সাইট বিভিন্ন দেশের ভূখণ্ডে রয়েছে এবং এগুলো প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত
  • যুক্তরাজ্য (United Kingdom): বিশ্বের সর্বোচ্চ রামসার সাইটের সংখ্যা (প্রায় ১৭৬টি)।
  • মেক্সিকো (Mexico): দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রামসার সাইট (প্রায় ১৪৪টি)।
  • ভারত (India) – তৃতীয় সর্বোচ্চ রামসার সাইট রয়েছে।

২০২৬ পর্যন্ত ভারতের রামসার সাইট: State-wise

রাজ্য / কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলরামসার সাইটের সংখ্যারামসার সাইটের নাম
তামিলনাড়ু২০পয়েন্ট ক্যালিমের, ভেদান্থাঙ্গল, পল্লিকরণাই মার্শ, করিকিলি, কুনথানকুলাম, উধয়ামার্থান্ডাপুরম, ভেলোডি, আদামপাক্কাম, ভাদুভুর, কোদিয়াক্কারাই সহ অন্যান্য
উত্তর প্রদেশ১১নবাবগঞ্জ, সমাসপুর, পার্বতী অরাই, সর্সাই, বিজয় সাগর, নাখানা, হস্তিনাপুর, হাইডেলগড়, সলনাপুর, বারুয়া, পাটনা পাখি অভয়ারণ্য
ওড়িশাচিলিকা লেক, ভীতরকণিকা ম্যানগ্রোভ, সাতকোসিয়া, হীরাকুদ রিজার্ভয়ার, আন্সুপা লেক, দেবী নদীর মোহনা
পাঞ্জাবহরিকে, রোপার, কাঞ্জলি, নাংলা, বেয়াস সংরক্ষণ রিজার্ভ, কেশোপুর–মিয়ানি
বিহারকাবর তাল (কাঁওয়ার লেক), নাগি ড্যাম, নক্তি ড্যাম, গোকুল জলাধার, গোগাবিল লেক, উদয়পুর লেক
জম্মু ও কাশ্মীর (UT)ওয়ুলার লেক, হোকরসার, হাইগাম, শালবাগ, অনচর
মধ্যপ্রদেশভোজ জলাভূমি, সাখ্যা সাগর, ইয়াশোধনগর, সিরপুর লেক, পাতাই ড্যাম
রাজস্থানসম্বর লেক, কেওলাদেও, খীচন, মেনার, সিলিসেরহ লেক
গুজরাটনাল সরোবর, থোল লেক, খিজাডিয়া, ছাড়ি–ধান্দ
কর্ণাটকরঙ্গনাথিট্টু, আগনাশিনী মোহনা, মাগাদি কেরি, কার্তিকেরি
কেরালাভেম্বানাড–কোল, অষ্টমুদি, শাস্তামকোটা
হিমাচল প্রদেশপং ড্যাম লেক, চন্দ্র তাল, রেণুকা লেক
মহারাষ্ট্রলোনার লেক, নন্দুর মাধমেশ্বর, ঠানে ক্রিক
পশ্চিমবঙ্গসুন্দরবন জলাভূমি, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি
লাদাখ (UT)ত্সোমোরিরি, ত্সো–কার
অসমদীপোর বিল
অন্ধ্র প্রদেশকোল্লেরু লেক
গোয়ানন্দা লেক
মণিপুরলোকটাক লেক
মিজোরামপালাক জলাভূমি
সিকিমখেচেপেরি লেক
ঝাড়খণ্ডউধওয়া লেক
ত্রিপুরারুদ্রসাগর লেক
উত্তরাখণ্ডআসান সংরক্ষণ রিজার্ভ
ছত্তিশগড়কোপরা জলাধার
দিল্লি (UT)ওখলা পাখি অভয়ারণ্য
আন্দামান ও নিকোবর (UT)সাউথ আন্দামান ম্যানগ্রোভ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top