শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা (Child Centred Education)

আধুনিক শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো শিক্ষার্থী বা শিশু। যে শিক্ষাব্যবস্থা শিশুর আগ্রহ, সামর্থ্য, প্রবৃত্তি, রুচি, মানসিক সক্ষমতা ও প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে তাকে শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা বলা হয়। এই শিক্ষাব্যবস্থায় শিশু হলো শিক্ষার প্রধান চালিকা শক্তি, আর শিক্ষক এখানে মূলত সহায়ক ও পথপ্রদর্শক (Facilitator)।
👉 শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার জনক: রুশো (Rousseau) এছাড়া ফ্রয়েবেল (Froebel) শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা ও প্রথাগত শিক্ষার মধ্যে পার্থক্য
| SL. NO | প্রথাগত শিক্ষা | শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা |
|---|---|---|
| 1 | শিক্ষককেন্দ্রিক | শিশুকেন্দ্রিক |
| 2 | শিক্ষকই প্রধান | শিক্ষার্থী/শিশুই প্রধান |
| 3 | মুখস্ত করা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য | অর্থপূর্ণ শিখন (Meaningful Learning) উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য |
| 4 | শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয় | শিক্ষার্থীরা সক্রিয় |
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার বৈশিষ্ট্য
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—
➤ এই শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে শিশু/শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক।
➤ শিশুর মধ্যে বহুমুখী পরিবেশে অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
➤ পাঠক্রম হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক, যেখানে শিশুর আগ্রহ, সামর্থ্য, রুচি ও চাহিদা বিচার করে পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করা হয়।
➤ এই শিক্ষাপদ্ধতি সক্রিয়তা ভিত্তিক (Activity-based)।
➤ শিক্ষামূলক উপকরণ (TLM) শিশু নিজে স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারে।
➤ শিশুর সর্বাঙ্গীণ বিকাশ (শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক) ঘটে।
➤ এখানে শিশুর সৃজনশীলতা ও মৌলিক চিন্তা (Creative Thinking) বিকশিত হয়।
➤ ব্যক্তিমূলক প্রচেষ্টা ও স্বতন্ত্রতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন: রুশো, হার্বাট, ফ্রয়েবেল, পেস্টালৎসি, ইরাসমাস প্রমুখ শিক্ষাবিদরা।
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার বাধাসমূহ
যদিও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা শিশুর সর্বাঙ্গীণ বিকাশে গুরুত্ব দেয়, তবুও বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু বাধা দেখা যায়—
➤ শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও মানসিক পার্থক্য
➤ পরিবারের ভূমিকা ও সহযোগিতার অভাব
➤ আর্থিক/সামাজিক কারণে সুযোগের অভাব
➤ শিক্ষাব্যবস্থার সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাব
➤ বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি (Exam oriented system) শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিপন্থী
➤ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা
➤ বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কার ও পিছিয়ে থাকা মনোভাব
প্রগতিশীল শিক্ষা (Progressive Education)
প্রগতিশীল শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নমনীয় মনোভাব গ্রহণ। অর্থাৎ, শিক্ষা হবে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, বাস্তব সমস্যা সমাধানমূলক এবং শিশুর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা।
👉 প্রগতিবাদ দর্শনের মূল ভিত্তি-
✅ পরীক্ষণবাদ (Experimentalism)
✅ প্রয়োগবাদ (Pragmatism)
👉 প্রগতিশীল শিক্ষার প্রবক্তা: উইলিয়াম জেমস (William James) ও জন ডিউই (John Dewey)
প্রগতিবাদী শিক্ষার বৈশিষ্ট্য
➤ প্রগতিবাদী শিক্ষায় শিশু হাতে-কলমে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতামূলক শিখন (Learning by Doing) এর মাধ্যমে শেখে।
➤ এখানে দলগত শিখন (Group Learning) এর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
➤ শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
➤ পাঠক্রম হয় সমন্বয়ী ও জীবনঘনিষ্ঠ।
➤ Life long learning অর্থাৎ “জীবনব্যাপী শিক্ষা”র উপর বিশেষ গুরুত্ব থাকে।
➤ কর্মভিত্তিক এবং প্রকল্পমূলক শিক্ষা (Project Method) অনুসরণ করা হয়।
➤ পাঠক্রমে সেবামূলক ও সামাজিক শিক্ষা সমন্বিত থাকে।
➤ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তা এবং যুক্তিভিত্তিক বিচার ক্ষমতা গড়ে ওঠে।
➤ এটি একটি Collaborative & Co-operative learning method অর্থাৎ সহযোগিতামূলক শিক্ষাপদ্ধতি।
➤ শিশুর সৃজনশীল ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হয়।
➤ পাঠ্যপুস্তকের তুলনায় শিক্ষণ সম্পদ/শিখন উপকরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা ও প্রগতিশীল শিক্ষার সম্পর্ক
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার সাথে প্রগতিবাদী শিক্ষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ—দুটি ব্যবস্থাই শিশুকে শিক্ষা প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে স্থাপন করে।
শিশুর সঠিক বিকাশের জন্য এই দুটি শিক্ষাব্যবস্থা একটি অপরটির পরিপূরক।
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিশুর রুচি ও সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা প্রদান করা হয়—এটাই প্রগতিশীল শিক্ষারও অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
প্রগতিশীল শিক্ষায় যেমন—শিশুকে সক্রিয় করে, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখায়, বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে শেখায়—এগুলো শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার লক্ষ্যকেই সমর্থন করে।
✅ তাই বলা যায়: শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা + প্রগতিশীল শিক্ষা = আধুনিক ও কার্যকর শিক্ষাপদ্ধতির ভিত্তি।
Child Centred Education – Interview Q&A
- শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার উদ্দেশ্য কী?
উত্তর : শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হলো শিশুকে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে তার ব্যক্তিসত্তা ও সামগ্রিক বিকাশ ঘটানো। অর্থাৎ শিশুর চাহিদা, আগ্রহ, প্রবণতা, রুচি, সামর্থ্য ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে তাকে শিক্ষা প্রদান করা।
এই শিক্ষাব্যবস্থায় লক্ষ্য থাকে-
✅ শিশুর মানসিক বিকাশ
✅ সৃজনশীলতা বৃদ্ধি
✅ স্বাধীন চিন্তা ও আত্মবিশ্বাস গঠন
✅ জীবনঘনিষ্ঠ ও বাস্তবভিত্তিক শিখন ঘটানো
সব মিলিয়ে বলা যায়, শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক সর্বাঙ্গীণ বিকাশ সাধন করাই শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
- শিশু শিক্ষার জনক কে?
উত্তর : শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার জনক (Father of Child Centered Education) হলেন ফরাসি শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক জঁ-জাক রুশো (Jean Jacques Rousseau)। তিনি শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রথমবার শিশুর স্বাধীনতা, প্রকৃতিনির্ভর শিক্ষা এবং শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ—এই বিষয়গুলিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন।
- শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রবর্তক কে?
উত্তর : শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রধান প্রবর্তক বা প্রবক্তা (Propounder of Child Centered Education) হলেন জঁ-জাক রুশো (Jean Jacques Rousseau)। কারণ শিশুকে তিনি শিক্ষার মূল বিষয় হিসেবে দেখেছেন এবং শিক্ষাকে করেছেন শিশুর প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক।
- রুশোকে কেন শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার জনক বলা হয়?
উত্তর : রুশোকে শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার জনক বলা হয় কারণ: তিনি সর্বপ্রথম শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুর চাহিদা, আগ্রহ, প্রবণতা, দক্ষতা, সামর্থ্য ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে শিক্ষাদানের কথা বলেছেন।
রুশো মনে করতেন: “প্রকৃতিদত্ত সবকিছুই ভালো, কিন্তু মানুষের হাতে তা কলুষিত হয়।”
তাই তিনি শিশুদের প্রকৃতির কোলের মধ্যে মুক্তভাবে শেখার সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। তিনি মুখস্তনির্ভর শিক্ষা বা কঠোর শাসনকে সমর্থন করেননি; বরং শিশু যেন মুক্ত পরিবেশে আনন্দের সাথে শেখে; এই ধারণাই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
- রুশোর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থটির নাম কী?
উত্তর : রুশোর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থটির নাম হলো;
✅ “এমিল” (Emile)
তবে রুশোর সর্বাধিক জনপ্রিয় রাজনৈতিক গ্রন্থ হলো;
✅ “Social Contract”
- রুশো সম্পর্কে কিছু জানো?
উত্তর : হ্যাঁ স্যার/ম্যাডাম, আমি জানি। ফরাসি বিপ্লবের প্রেরণা ও আবেগ সৃষ্টিকারী মনীষীদের মধ্যে জঁ-জাক রুশো অন্যতম। অনেকেই তাঁকে ফরাসি বিপ্লবের চিন্তার অন্যতম ভিত্তি বলে মনে করেন।
রুশোর সর্বাধিক জনপ্রিয় গ্রন্থ হলো “Social Contract” (১৭৬২)। এই গ্রন্থে তিনি আধুনিক গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি বিভিন্ন যুক্তি ও তর্কের মাধ্যমে বলেন:
✅ রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তির উৎস জনগণ
✅ রাজা ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতাবলে শাসন করেন; এই ধারণা তিনি নস্যাৎ করেন
✅ জনগণই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি
রুশোর এই চিন্তাধারা পরবর্তীতে গণতন্ত্রের বিকাশে অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে।
- শিশু শিক্ষাকে কে খেলাভিত্তিক করতে চেয়েছিলেন?
উত্তর : শিশু শিক্ষাকে খেলাভিত্তিক করতে চেয়েছিলেন রুশো (Jean Jacques Rousseau)। তিনি মনে করতেন শিশুদের শিক্ষা হওয়া উচিত আনন্দময় ও স্বতঃস্ফূর্ত। তবে পরবর্তীকালে শিক্ষাবিদ কুক (Cook) শিশুদের শিক্ষা আরও কার্যকর করতে খেলাভিত্তিক শিক্ষার প্রবর্তন করেন এবং তা জনপ্রিয় করে তোলেন।
- শিশুদের শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী করে তোলার জন্য তোমার শিক্ষণ পরিকল্পনা কেমন হবে?
উত্তর : স্যার/ম্যাডাম, শিশুদের শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী করে তোলার জন্য আমি আমার পাঠ পরিকল্পনা এমনভাবে তৈরি করব যাতে শিশুরা আনন্দের সাথে শিখতে পারে এবং ক্লাসে সক্রিয় অংশ নেয়।
আমি ব্যবহার করব:
✅ হাতে-কলমে শিক্ষা (Learning by Doing)
✅ খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষা (Play Way Method)
✅ গ্রুপ ওয়ার্ক ও জোড়ায় কাজ (Pair work)
✅ গল্প বলা, গান, ছড়া, অভিনয়
✅ ছবি, চার্ট, মডেল, ফ্ল্যাশকার্ড ইত্যাদি দর্শন ও শ্রবণযুক্ত TLM
✅ প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা (Interaction)
এর ফলে শিশুরা ক্লাসকে ভয় পাবে না, বরং কৌতূহলী হবে, সক্রিয় থাকবে এবং নিজে থেকেই শিখতে আগ্রহী হবে।
- তুমি কীভাবে শ্রেণিকক্ষে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করবে এবং শিশুদের নিয়ন্ত্রণ করবে?
উত্তর : শ্রেণিকক্ষে একটি উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ তৈরির জন্য আমি প্রথমেই শিশুদেরকে শ্রেণিকক্ষের নিয়ম-কানুন ও শৃঙ্খলা সম্পর্কে সহজভাবে অবগত করব। তবে কঠোর শাসন নয়, বরং পজিটিভ ডিসিপ্লিন অনুসরণ করব।
আমি করব:
✅ ইতিবাচক আচরণে উৎসাহ (Positive Reinforcement)
✅ প্রশংসা, স্টিকার, স্টার চার্ট ব্যবহার
✅ শিশুদের সবসময় উৎসাহী ও আগ্রহী করে তোলা
✅ প্রত্যেকটি Activity তে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা
✅ শিশুদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া
✅ দায়িত্ব প্রদান (Class monitor, group leader)
✅ শ্রেণিকক্ষকে শিশুবান্ধব ও আনন্দময় রাখা
শিশুদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে আমি পরিস্থিতিভেদে বিভিন্ন শিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করব, যাতে তারা বিরক্ত না হয় এবং Discipline বজায় থাকে।
- শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন ধরনের শিশু থাকে; একজন শিক্ষক হিসেবে তাদের চাহিদা কীভাবে পূরণ করবে?
উত্তর : স্যার/ম্যাডাম, শ্রেণিকক্ষে প্রতিটি শিশু আলাদা; কারও শেখার গতি বেশি, কারও কম। তাই সবার চাহিদা পূরণ করার জন্য আমি প্রথমে শিশুদের পর্যবেক্ষণ (Observation) করব এবং তাদের শেখার স্তর বুঝব।
তারপর আমি:
✅ Differentiated Teaching পদ্ধতি ব্যবহার করব
✅ পাঠ পরিকল্পনা (Lesson Plan) শিশুদের প্রয়োজন অনুযায়ী করব
✅ যারা পিছিয়ে আছে তাদের জন্য অতিরিক্ত সাহায্য ও Remedial Teaching দেব
✅ যারা এগিয়ে আছে তাদের সৃজনশীলতা বাড়াতে Enrichment Activity দেব
✅ Group work এর মাধ্যমে দুর্বল শিশুরা সহযোগিতা পাবে
✅ ব্যক্তিগত উৎসাহ ও যত্ন দেব
এর ফলে ক্লাসের সব শিশু সমান সুযোগ পাবে এবং ধীরে ধীরে সবাইকে শেখার মূল স্রোতে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।