ভারতবর্ষের শিক্ষা ও সাহিত্যক্ষেত্রে এমন এক মহাপুরুষ রয়েছেন, যাঁর জীবন ও কর্ম সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত এবং ভবিষ্যতেও যাঁর অবদান বিশ্ববাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে—তিনি হলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই বিখ্যাত পরিবারেই ১৮৬১ সালের ৭ মে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভারতীয় সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী চেতনাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন।
সাহিত্যে তাঁর অনন্য কীর্তি ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯১৩ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তবে রবীন্দ্রনাথ কেবল সাহিত্যিকই ছিলেন না—শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর দূরদৃষ্টি ও চিন্তাধারা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশ্বখ্যাত। তাঁর উদ্যোগে ১৯০১ সালে বোলপুরের শান্তিনিকেতনে ‘পাঠভবন’ নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরে ১৯২১ সালে ‘বিশ্বভারতী’ নামে পরিচিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন প্রবন্ধে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার আলোচনা করেছেন। যেমন—‘শিক্ষার হেরফের’, ‘তোতা কাহিনী’, ‘শিক্ষা-সমস্যা’, ‘স্ত্রীশিক্ষা’ ইত্যাদি লেখায় তিনি শিক্ষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। অবশেষে ১৯৪১ সালে এই মহান কবি ও শিক্ষাবিদ পরলোক গমন করেন।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাভাবনা তাঁর জীবনদর্শনের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। তাঁর শিক্ষাচিন্তা কখনও শুধু তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি তা বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগও করেছেন। রবীন্দ্রনাথ একদিকে ভাববাদী চিন্তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও, শিক্ষা বাস্তবায়নের সময় তিনি প্রকৃতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। তাঁর মতে, প্রকৃত শিক্ষা হলো সেই শিক্ষা—যা কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, বরং বিশ্বসত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের জীবনকে গড়ে তোলে এবং পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বিকশিত হতে সাহায্য করে।
(i) রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন ভাববাদ, প্রকৃতিবাদ ও প্রয়োগবাদসহ নানা দার্শনিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তাঁর শিক্ষাচিন্তার বাস্তব রূপ দেখা যায় বিশ্বভারতী ও শ্রীনিকেতন-এর মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শনের পাঁচটি প্রধান দিক নিম্নরূপ—
(1) প্রাকৃতিক এবং সামাজিক পরিবেশে শিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ শিক্ষাকে সমর্থন করতেন না। তিনি মুক্ত আকাশের নিচে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিক্ষাদানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন। এই ভাবনা থেকেই তিনি শান্তিনিকেতনের উন্মুক্ত প্রান্তরে ব্রহ্মচর্যাশ্রম নামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
(2) শিক্ষায় আনন্দ: রবীন্দ্রনাথের মতে, আনন্দের মধ্য দিয়েই প্রকৃত শিক্ষা সম্ভব। কেবল পুথিগত বা মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা কোনো শিক্ষার্থীর মনে প্রকৃত আনন্দ আনতে পারে না। শিক্ষাকে আনন্দময় করতে হলে হৃদয়বৃত্তির বিকাশ জরুরি। তাই আশ্রমিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের আনন্দের জন্য তিনি পাঠক্রমে নানা ধরনের সৃজনশীল কার্যকলাপ—যেমন গান, নাচ, আঁকা, নাটক প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
(3) শিক্ষায় স্বাধীনতা: রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীনতার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দিলে তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙ্খলাবোধ গড়ে উঠবে। তবে তিনি এ বিষয়েও সতর্ক ছিলেন যাতে স্বাধীনতা কখনো স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত না হয়।
(4) শিক্ষা ও বিকাশ: রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শনের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিকাশ। বিকাশ বলতে তিনি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিসত্তার পূর্ণ বিকাশকে বুঝিয়েছেন। তাঁর মতে শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত প্রতিভা ও সামর্থ্যকে উন্মোচন করে এবং একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর দেহ, মন ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশে সহায়তা করে।
(5) সক্রিয়তার মাধ্যমে শিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ সক্রিয়তাভিত্তিক শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। শিশু যেমন খেলাধুলোর মাধ্যমে নিজের সক্রিয়তা প্রকাশ করে, তেমনি বয়স্ক মানুষ কাজের মাধ্যমে সক্রিয়তা প্রদর্শন করে। তাই তাঁর আশ্রমিক শিক্ষাব্যবস্থায় খেলা ও কাজ—উভয়কেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শ্রীনিকেতনে তিনি কর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যেখানে হাতে-কলমে শিক্ষা ও বাস্তব কাজের মাধ্যমে শেখার সুযোগ ছিল।
এইভাবে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শনে শিক্ষার মৌলিক দিকগুলির সুস্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়।
(ii) রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে শিক্ষার লক্ষ্য
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রচলিত বা গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। কারণ তাঁর মতে, এই শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের দেশের রীতিনীতি, আদর্শ ও সংস্কৃতির উপযুক্ত স্থান দেওয়া হয়নি। তিনি মনে করতেন যে বিদ্যালয়ে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ভাববাদী দর্শনের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেন এবং শিক্ষায় ব্যক্তিত্বের সর্বাঙ্গীণ বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেন। তাঁর মতে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্যগুলি হবে:
(1) বৌদ্ধিক বিকাশ: রবীন্দ্রনাথের মতে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তাশক্তির বিকাশ। তিনি বলেছেন—যে শিক্ষা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে জাগ্রত ও সক্রিয় করে এবং আমাদের মনকে অজ্ঞতা ও অবুদ্ধির প্রভাব থেকে মুক্ত করতে পারে, সেই শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষের দুঃখ-দুর্দশার অবসান সম্ভব।
(2) দৈহিক বিকাশ: অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের চাপ অনেক সময় শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে ওঠে। জ্ঞান অর্জন করতে গিয়ে স্বাস্থ্য হারানো কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার্থীদের দৈহিক সুস্থতা ও শারীরিক বিকাশের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। এজন্য তিনি শিক্ষা-পরিকল্পনায় মুক্ত প্রকৃতিতে খেলাধুলো, দৌড়ঝাঁপ প্রভৃতির ব্যবস্থা রাখার কথা বলেছেন।
(3) নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশ: রবীন্দ্রনাথের মতে সর্বব্যাপী পরমসত্তা আমাদের ছায়ার মতো সর্বদা সঙ্গে থাকে এবং তাঁকে উপলব্ধি করাই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য। তাই শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে তিনি নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের বিকাশকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই কারণেই শান্তিনিকেতনের শিক্ষা-পরিকল্পনায় নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
(4) সামাজিক গুণাবলির বিকাশ: স্বামী বিবেকানন্দের মতো রবীন্দ্রনাথও মনে করতেন যে সকল মানুষের মধ্য দিয়েই পরম ব্রহ্মের প্রকাশ ঘটে। ফলে শিক্ষা এমন হওয়া উচিত যাতে শৈশব থেকেই মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবপ্রেম, পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি এবং আর্তের সেবার মনোভাব গড়ে ওঠে। অর্থাৎ সামাজিক গুণাবলির বিকাশও শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য।
(5) জনশিক্ষার বিস্তার: রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার লক্ষ্য প্রসঙ্গে জনশিক্ষার বিস্তারকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। তাঁর মতে শিক্ষা শুধুমাত্র কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে দিতে হবে, যাতে সমাজের সর্বস্তরের উন্নতি সম্ভব হয়।
(iii) রবীন্দ্রনাথের পাঠক্রম পরিকল্পনা
শিক্ষার্থীর পূর্ণ বিকাশের কথা মাথায় রেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাঠক্রম পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি বিদ্যালয়কে কেবল পাঠদানের স্থান হিসেবে নয়, বরং মানবসংস্কৃতির অনুশীলনের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর মতে পাঠক্রম এমন হতে হবে যা শিক্ষার্থীর জ্ঞান, মনন, সৃজনশীলতা ও জীবনবোধকে বিকশিত করবে।
রবীন্দ্রনাথ পাঠক্রম পরিকল্পনায় প্রথমেই ভাষা ও সাহিত্যকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেন। তিনি আমাদের প্রাচীন সাহিত্য বিশেষ করে রামায়ণ ও মহাভারত পাঠের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, বিভিন্ন ধরনের কারুকর্ম, শিল্পকলা, নৃত্য-গীত, বাদ্য, নাট্যাভিনয় এবং পল্লি-হিতসাধনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা—এসবই মানবসংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। তাই এগুলো পাঠক্রমের অবশ্যই অংশ হওয়া উচিত।
রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বিশেষভাবে সমর্থন করেননি। তিনি মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি পাঠক্রমে সমাজসেবা ও উন্নয়নমূলক কাজ অন্তর্ভুক্ত করার কথাও তিনি বলেছেন, যাতে শিক্ষার্থীর মধ্যে মানবিকতা ও সমাজচেতনা গড়ে ওঠে।
এছাড়াও তিনি পাঠক্রমে খেলাধুলো, বাগানের কাজ, গল্প বলা, হাতের কাজ ইত্যাদিকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ এসব কাজের মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও বাস্তব জীবনের দক্ষতা উন্নত হয়।
(iv) রবীন্দ্রনাথের শিক্ষণপদ্ধতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নির্দিষ্টভাবে কোনো একক শিক্ষণপদ্ধতির কথা উল্লেখ করেননি। তবে তাঁর শিক্ষাভাবনা ও শিক্ষাচর্চা থেকে শিক্ষণপদ্ধতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে জানা যায়। তিনি মনে করতেন যে শিক্ষাদান হবে স্বাভাবিক, আনন্দময় এবং শিশুকেন্দ্রিক।
প্রথমত, রবীন্দ্রনাথ ইন্দ্রিয়ানুশীলন, প্রকৃতির পর্যবেক্ষণ এবং সৃজনধর্মী কাজকর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেছেন। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষা দিলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান স্থায়ী হয়—এই বিশ্বাস তাঁর ছিল।
দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথ প্রাচীনকালের তপোবনের শিক্ষা-ব্যবস্থা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তিনি মনে করতেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি আন্তরিক সম্পর্ক থাকে, তবে শিক্ষাদানের কাজ অনেক সহজ ও কার্যকর হয়ে ওঠে। গুরু-শিষ্যের মধুর সম্পর্ক শিক্ষার মান বৃদ্ধি করে—এই ধারণাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তৃতীয়ত, শ্রেণিশিক্ষণের গতানুগতিক প্রথার পরিবর্তে তিনি খোলা আকাশের নীচে ও প্রকৃতির মুক্ত পরিবেশে শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃতির মধ্যে শিক্ষা পেলে শিক্ষার্থীর মন সহজে বিকশিত হয় এবং শেখার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
চতুর্থত, শিক্ষার্থীকে সামাজিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিদ্যালয়ে যৌথ জীবনযাপন-এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। একসঙ্গে বসবাস, কাজকর্ম ও পড়াশোনার মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে সহযোগিতা, সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষণপদ্ধতির মূল কথা ছিল শিশুকে স্বাধীনতা দান। তিনি বিশ্বাস করতেন—স্বাধীন পরিবেশেই শিশুর প্রকৃত বিকাশ সম্ভব। তবে শান্তিনিকেতনে স্বাধীনতার পাশাপাশি সংযম ও ব্রহ্মচর্য পালনের কঠোর নির্দেশও ছিল, যাতে স্বাধীনতা শৃঙ্খলাহীনতায় পরিণত না হয়।
এছাড়া রবীন্দ্রনাথ সক্রিয়তাভিত্তিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়কে তিনি কেবল বই পড়ে নয়, বরং কাজের মাধ্যমে ও সক্রিয় অংশগ্রহণের দ্বারা শেখানোর কথা বলেছেন।
সবশেষে, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে তিনি মাতৃভাষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়—
“শিক্ষায় মাতৃভাষাই হবে মাতৃদুগ্ধ।”
তিনি মনে করতেন, ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যম হলে শিক্ষার্থীদের জীবনের অধিকাংশ সময় ভাষা শেখাতেই ব্যয় হয়, ফলে মূল বিষয়বস্তু হৃদয়ে গেঁথে ওঠে না। মাতৃভাষায় শিক্ষা না হলে শিক্ষালয়ের পাঠ্যবিষয় শিক্ষার্থীদের কাছে প্রাণবন্ত বা জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে ওঠে না—এ কথাও তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন।
(v) বিভিন্ন প্রকার শিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অভিমত (Rewrite)
বিভিন্ন প্রকার শিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমাজজীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছিলেন এবং মনে করতেন শিক্ষা মানুষের জীবনকে উন্নত ও মানবিক করে তোলে। বিভিন্ন প্রকার শিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অভিমত নীচে আলোচনা করা হল-
(1) জনশিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, শিক্ষা শুধু শহর বা সীমিত পরিসরের মধ্যে আবদ্ধ থাকলে চলবে না; শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য তিনি গ্রামের পাঠশালাগুলিকে জনশিক্ষা প্রসারের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছেন। জনগণের মধ্যে শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি যাত্রা, লোকনৃত্য, লোকসংগীত ইত্যাদি লোকসংস্কৃতির মাধ্যম ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন। রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন যে দেশের সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করতে হলে তাদের লেখাপড়া শেখা এবং সচেতন হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
(2) নারীশিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা ক্ষেত্রে সবার সমান অধিকার-কে সমর্থন করেছেন। তিনি বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে নারীশিক্ষার গুরুত্বও স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, সমাজের উন্নতির জন্য নারীশিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন যে স্ত্রী-পুরুষের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে যে প্রকৃতিগত পার্থক্য রয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থায় তার কিছু প্রতিফলন থাকা উচিত। নারীশিক্ষাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য তিনি শান্তিনিকেতনে সহশিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, যা সেই সময়ে খুবই অগ্রগামী চিন্তা ছিল।
(3) ধর্মশিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ ধর্মকে কখনও আচার-অনুষ্ঠানসর্বস্ব বলে মনে করেননি। তাঁর মতে, ধর্ম হলো অন্তরের উপলব্ধি এবং ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার পথ। এই উপলব্ধি বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; তা মানুষের অন্তর থেকেই জাগ্রত হয়। তাই তিনি ধর্মশিক্ষাকে “অন্তরের শিক্ষা” বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এই বিষয়ে তিনি ১৯১১ সালে ‘ধর্মশিক্ষা’ নামে একটি গ্রন্থও রচনা করেন।
(vi) রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার প্রয়োগ — শান্তিনিকেতন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শিক্ষাচিন্তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ১৯২১ সালে শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। শান্তিনিকেতন মূলত আশ্রমিক শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শে গঠিত ছিল, যেখানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আনন্দময় ও শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রদান করা হত। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে আশ্রমিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
(1) স্বাধীনতার প্রতি আস্থা: রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি এমন ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করতে পারে এবং নিজেদের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটাতে পারে।
(2) খোলা আকাশের নীচে শিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ শিক্ষাকে সমর্থন করতেন না। তাই শান্তিনিকেতনে খোলা আকাশের নীচে, গাছের তলায় পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যা শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রাখত।
(3) সহপাঠক্রমিক ও সৃজনশীল কার্যকলাপ: শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের শুধু বই পড়ানো হত না; বরং তাদের সহপাঠক্রমিক কাজ ও সৃজনমূলক কার্যকলাপে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হত। এর ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও আত্মপ্রকাশের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেত।
(4) বৈষম্যহীন পরিবেশ: শান্তিনিকেতনে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও আর্থিক বৈষম্য—কোনো প্রকার ভেদাভেদকে প্রশ্রয় দেওয়া হত না। এখানে ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে পড়াশোনা করত, একসঙ্গে থাকা-খাওয়া করত, ফলে সমতা ও সহাবস্থানের শিক্ষা গড়ে উঠত।
(5) মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান: রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাই শান্তিনিকেতনে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হত, যা শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ, স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত করে তুলত।
(6) কর্মভিত্তিক ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ: শান্তিনিকেতনে কেবল তত্ত্বগত শিক্ষা নয়, বাস্তব কাজ শেখার উপরও জোর দেওয়া হয়েছিল। এখানে শিক্ষার্থীদের কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প, কাঠের কাজ, মাটির কাজ, চামড়ার কাজ, কৃষিকাজ এবং উদ্যান পরিচর্যার শিক্ষা দেওয়া হত। এর ফলে তারা বাস্তব জীবনমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পারত।
(7) সমাজসেবা ও পল্লি-উন্নয়নমূলক কাজ: শান্তিনিকেতনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজসেবা ও পল্লি উন্নয়নমূলক কার্যক্রম। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন শিক্ষা তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন শিক্ষার্থী সমাজের কল্যাণে কাজ করতে শেখে। তাই সমাজকল্যাণমূলক কাজকে শান্তিনিকেতন শিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে রাখা হয়েছিল।
(vii) রবীন্দ্রনাথের পল্লি-উন্নয়নমূলক শিক্ষার প্রয়োগ — শ্রীনিকেতন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পল্লি-উন্নয়নের আদর্শকে সামনে রেখে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি শান্তিনিকেতনের নিকটবর্তী সুরুল গ্রামে শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে তিনি গ্রামীণ শিক্ষার প্রসার ও বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্যে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ‘শ্রীনিকেতন শিক্ষাসত্র’ নামে একটি গ্রামীণ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবিষয়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ কৃষির উন্নতি, নানা ধরনের হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের বিকাশ এবং বিভিন্ন প্রকার সমাজ উন্নয়নমূলক কার্যাবলি অন্তর্ভুক্ত করেন। এখানে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে হাতে-কলমে কাজ শেখানোর পদ্ধতিকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়। এইভাবে গ্রামীণ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ একদিকে যেমন গ্রামবাসীদের শিক্ষার বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে তেমনি উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে একটি গ্রামকে স্বনির্ভর ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
শ্রীনিকেতনের মাধ্যমে গ্রামজীবনে যেসব সংস্কার করতে চেয়েছিলেন
শ্রীনিকেতনের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ পল্লিবাংলার গ্রামজীবনে যে পরিবর্তন ও সংস্কার আনতে চেয়েছিলেন, সেগুলি হল—
- গ্রামবাসীদের জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তাদের সাহায্য করা।
- শিক্ষার্থীদের কৃষি-খামারে হাতে-কলমে কাজ শেখাবার ব্যবস্থা করা।
- প্রতিটি শিক্ষার্থীকে গ্রামের উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা।
- সমবায় সমিতি গঠন করে গ্রামোন্নয়নের ব্যবস্থা করা এবং গ্রামে স্বাস্থ্যরক্ষার কর্মসূচি গ্রহণ করা।
- শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা এবং গ্রামের সাধারণ মানুষের কল্যাণমূলক কাজে উৎসাহিত করা।
- চাষের কাজ ছাড়াও পশুপালন, কাঠের কাজ, তাঁতের কাজ, মৌমাছি পালন ইত্যাদি বৃত্তিমূলক কাজে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
(viii) আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা
আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা যে তত্ত্বগতভাবে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত—এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য, পরিবেশ, পাঠক্রম, শিক্ষণপদ্ধতি ও মূল্যবোধগত দিকগুলির মধ্যে রবীন্দ্র-শিক্ষাদর্শের প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। এই প্রাসঙ্গিকতা মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রকাশ পেয়েছে—
(1) শিশুর অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার বিকাশ: রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষাদর্শে শিশুর অন্তর্নিহিত প্রতিভা ও সম্ভাবনার বিকাশ এবং চরিত্রগঠনকে শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আধুনিক শিক্ষাতেও শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ ও চরিত্রগঠনকে বিশেষ লক্ষ্য বলে বিবেচনা করা হয়।
(2) শিক্ষার পরিবেশ: রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন শিক্ষার পরিবেশ অবশ্যই আকর্ষণীয়, মুক্ত ও আনন্দময় হওয়া দরকার। তিনি ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে মধুর ও আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাতেও বিদ্যালয় পরিবেশকে শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় করার ওপর জোর দেওয়া হয় এবং ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ রয়েছে।
(3) মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষাচিন্তায় শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষাধারার মধ্যে সমন্বয়ের কথাও বলেছেন। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান এবং দেশীয় সংস্কৃতি ও বিশ্বজ্ঞান—দুইয়ের সমন্বয় ঘটানোর বিষয়টি বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের সুপারিশে গুরুত্ব পেয়েছে।
(4) শিক্ষার মাধ্যমে জাতীয় সংহতি ও আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্য রক্ষা: রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার মাধ্যমে জাতীয় সংহতি স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্য গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় জাতীয় ঐক্য, সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বোঝাপড়ার বিষয়টি রবীন্দ্র-শিক্ষাদর্শ থেকেই ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে।
(5) প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, প্রকৃত মানুষ গঠন ও আনন্দদায়ক শিক্ষার গুরুত্ব: বীন্দ্রনাথ প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, আনন্দময় শিক্ষা এবং প্রকৃত মানুষ গঠন—এই তিনটি বিষয়কে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখেছেন। বর্তমান জাতীয় শিক্ষানীতিতেও আনন্দদায়ক শিক্ষাব্যবস্থা, প্রকৃতিনির্ভর শিক্ষা এবং শিশুর সামগ্রিক মানবিক বিকাশের উপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
(ix) রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার মূল্যায়ন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমস্ত দিক থেকেই ছিলেন একজন মহাপুরুষ। তিনি মূলত কবি হলেও শিক্ষাজগতে তাঁর এত প্রাধান্য পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা। তিনি জীবনের শেষ চল্লিশ বছর প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ব্যয় করেন। রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন যে কৃত্রিম ও যান্ত্রিক শিক্ষা কখনও মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে না।
তিনি মনে করতেন কোনো জাতির প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় তার শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে। তাই তিনি নিজের শিক্ষাভাবনা ও শিক্ষাচিন্তাকে সব ধরনের কুসংস্কার থেকে দূরে রেখেছিলেন। ইউনেস্কো (UNESCO) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু আগেই তাঁর বিশ্বভারতীর পরিকল্পনায় বিশ্বমানবতার আদর্শ ও আন্তর্জাতিক চেতনার মূল সুর ধ্বনিত হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন—বিশ্বশান্তি এবং বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার একমাত্র কার্যকর পথ হলো শিক্ষা। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, সাহিত্যের পাশাপাশি শিক্ষার ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথের অবদান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ।